মঙের চুনি - অজেয় রায় Monger Chuni by Ajeo Ray

 

লীর দোকানে ঢুকে মঙ এক কোণে দাঁড়াল। আর একজন খদ্দের ছিল। তাকে জিনিস দিয়ে বিদায় করে মঙের দিকে ফিরল।—কী চাই?
চাল।' ছােকরাটি চাল দেওয়ার বদলে মঙকে একবার তির্যক দৃষ্টিতে দেখে নিয়ে সােজা মালিক লীর কাছে হাজির হল। লী টেবিলে খাতার ওপর হিসাব করছিল। কর্মচারীটি তাকে কী জানি বলতে মুখ তুলে মঙকে দেখল। তারপর হেঁড়ে গলায় হেঁকে উঠল—কী ব্যাপার মঙ? আবার কী চাই! পয়সা আছে?
মঙ কাচুমাচু ভাবে বলল, না পয়সা আনিনি। লিখে রাখ। পরে সব শােধ করে দেব। 
উফ, আর ধার হবে না। এক সপ্তাহ ধারে ধারে চলছে। তােমার মতাে খদ্দেরের সঙ্গে বেশিদিন কারবার করলে বাপু আমার ব্যবসা লাটে উঠবে। ব্যবসা করতে এসেছি আমি। দানছত্র তাে খুলিনি। নেহাত পুরনাে খদ্দের বলে অ্যাদ্দিন চুপ করে ছিলাম।
মঙ অসহায়ের মতাে দাঁড়িয়ে থাকল। আস্তে আস্তে বলল—তােমার ধার আমি কবে শোধ করিনি, লী?
হু—তা করেছ। তবে এবার আর আশা দেখছি না। লী চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। গােদা গােদা হাত দুটো টেবিলের ওপর রেখে বেলুনের মতাে ফুলাে মুখটা সামনে বাড়িয়ে খুব মিহি সুরে বললে, 'বুঝলে বুড়াে, একটা ভালাে পরামর্শ দিচ্ছি শােনাে। কেন মিছামিছি সময় নষ্ট করছ? তােমার বরাতে আর পাথর টাথর নেই। তাই বলি এবার দেশে ফিরে যাও। কাজকম্ম করাে। বুনাে হাঁসের পিছনে ছুটে নিজে মরছ। অন্যদেরও জ্বালাচ্ছ। গত দু'বছর ধরে তাে দেখছি। হ্যা, যাওয়ার আগে আমার ধার-টারগুলাে শােধ করে যেও কিন্তু।
মঙ কোনাে উত্তর না দিয়ে দোকান থেকে বেরিয়ে এল। লীয়ের তীক্ষ্ণ বিদ্রুপ তাকে যেন ধাক্কা দিয়ে বের করে দিল। ক্ষোভে দুঃখে সে দিশেহারা বােধ করছিল। বয়স ও দারিদ্র্যে জীর্ণ তার শরীর ধনুকের মতাে নুইয়ে পড়েছিল তার শীর্ণ বেড়ানাে মুখে অজস্র ঊজ। এলােমেলাে ভাবে পা ফেলে মঙ ভাবতে ভাবতে পথ চলল।
আজ থেকে চল্লিশ বছর আগে সে প্রথম এই অঞ্চলে এসেছিল। এই-রত্নের দেশে। সত্যি, এমন দুরবস্থা তার কখনও হয়নি। খারাপ সময় আগেও অনেকবার এসেছে। কয়েকমাস যাবৎ কিছু পায়নি। কিন্তু তারপর আবার সৌভাগ্যের মুখ দেখেছে। কয়েকটি দামি পাথর পেয়ে গিয়েছে। কিন্তু এবার যেন ভাগ্যদেবী আর মুখ তুলে চাইছেনই না। গত দু'বছরে যে ক'টা পাথর পেয়েছে তা অতি সামান্য। বিক্রি করে কয়েকমাসের রসদ কেনার পয়সাও জোটেনি। মাঝে মাঝে পাথর খোজা বন্ধ করতে হয়েছে। এই গ্রামের কাছাকাছি কোথাও গিয়ে গায়ে গতরে খেটে তিল তিল করে পয়সা জমিয়ে, আবার ফিরে এসে কাজে নেমেছে। কিন্তু প্রত্যেকবারই পয়সা শেষ হয়ে গিয়েছে। ভাগ্য ফেরেনি। ফের অভাব দেখা দিয়েছে। ধার জমেছে।
শুধু লী কেন? কিছুদিন হল অনেকেই তাকে দেখলে ঠাট্টা করছে। গায়ে পড়ে উপদেশ দিচ্ছে। যাও হে বুড়াে, এবার ফিরে যাও। কোনােদিন রাস্তায় পড়ে বেঘােরে মরবে। খালি পেটে পাথর ভাঙা কি এই বয়সে পােষায়।
গ্রামের প্রায় সীমানায় কোম্পানির আমলে তৈরি ভাঙাচোরা দোতালা পাকা বাড়িটায় ভূতুড়ে নিস্তব্ধতা। কোম্পানির বাড়িটা ছাড়িয়ে কিছু দূরে মঙের ছােট্ট কুটির। একটি মাত্র ঘর। বাঁশের দেওয়ালের ওপর খড় ছাওয়া। মঙের মতাে তার বাসস্থানটিরও চরম দুরবস্থা। এবার বর্ষা বুঝি কাটে না!
কুটিরের সামনে বেদির মতাে পাথরটায় বসে পড়ল মঙ। ক্লান্ত পা দুটোকে ছড়াল। পরনের প্যান্টটায় সর্বাঙ্গে তালি মারা। শার্টটা ঘাড়ের কাছে ফেঁসে গিয়েছে। দুটোই চিরকুটে ময়লা। এক টুকরাে সাবান পেলে কেচে পরিষ্কার করে নেওয়া যেত। কিন্তু সাবান কেনার পয়সা কই? পেটের ভাত জোটে না তাে সাবান!
হ্যা, লােকরা ঠিকই বলে, তাকে নেশায় ধরেছে। রত্নের নেশা। চল্লিশ বছর আগে যখন বর্মা-রুবি মাইনস-এ কাজ করতে আসে তখন কি মঙ জানত উত্তর বর্মার মগােক প্রদেশে এই বনজঙ্গল পাহাড় রাজ্যে ঘুরে ঘুরে তার বাকি জীবনটা কেটে যাবে। তার দেশ এখান থেকে প্রায় দেড়শাে মাইল দূরে। সেখানে তার নিজের বাড়ি আছে। বাড়ি যেত বছরে অন্তত একবার। এখন পাঁচ বছর যায়নি। খালি হাতে ফিরতে তার লজ্জা করে।
পাথরের রহস্য জানতে তার কম দিন লাগেনি, একটু একটু করে জেনেছে। ক্রমে নেশা ধরেছে। বর্মারুবি মাইন-এ কাজ করার সময় সে প্রথম পাথর চিনতে শুরু করে। জানে এই দেশের মাটির তলায় আছে মণিমাণিক্যের ভাণ্ডার। নানান জাতের মূল্যবান কোরাম পাথর। চুনি, নীলা, চন্দ্রকান্তমণি। মাটি খুঁড়ে পাথর ভেঙে বের করা আর চিনতে শেখা পাথরের জাত। কোনটা দামি কোনটা খেলা। কোম্পানিতে সে ছিল মজুর। মাটি পাথর কাটার কাজ। রত্নপাথর ঘাটাঘাটির তেমন সুযােগ ছিল না। কিন্তু আর পাঁচজনের মতাে সেও কাজের ফাঁকে কিছু কিছু করে পাথরের জাত বিচারের বিদ্যে রপ্ত করেছিল। বছর দশেক পরে কোম্পানি বন্ধ হয়ে গেল। অনেক কর্মচারী কিন্তু গেল না। লাইসেন্স নিয়ে নিজেরাই প্রসপেকটিং শুরু করে দিল। মঙও থেকে গেল। তখন থেকে তার ভাগ্যের ওঠানামার ইতিহাসের শুরু।
মঙ মাথা নেড়ে বিড় বিড় করতে লাগল। পেয়েছি, অনেকবার পেয়েছি। রাখতে পারিনি টাকা।
মঙ চিরকাল বেহিসেবি। উড়নচণ্ডী যখনই দামি পাথর বেচে মােটা টাকা হাতে পেয়েছে। দু-হাতে উড়িয়েছে। বন্ধু-বান্ধব নিয়ে দেদার ফুর্তি করেছে। ব্যস, দু’দিনে ফতুর, আবার যে কে সেই পাথর ফাটান। প্রাণান্ত পরিশ্রম করা উদাস চোখে গ্রামের ঘরবাড়ির দিকে চেয়ে মঙ ভাবতে লাগল এক সময় কী জমজমাটই না ছিল এই গ্রাম। পুরনাে দিনের সেই ছবি মঙের মনে ভাসে। বড় বড় বাড়ি। সুন্দর দোকানপাটে কত লােকজনের আনাগােনা। ইরাবতী নদীর কুলে ঘাটে সর্বদা নৌকোর ভিড়। লঞ্চও বাঁধা থাকত দু'একটা। বর্মারুবি মাইনস-এর দিন শেষ হওয়ার পরেও অনেককাল বাড়বাড়ন্ত ছিল এই গ্রাম। তারপর ক্রমে অবস্থা খারাপ হতে থাকে। কেবল এই গ্রাম নয়। এ অঞ্চলের আরও অনেক গ্রাম যারা রত্নপাথরের খনিগুলির দৌলত ফেঁপে উঠেছিল সবারই ভাগ্যরবি যেন অস্ত গেল।
মাটির তলায় লুকনাে মণিমাণিক্যের ভাণ্ডার যেন ফুরিয়ে গেল। দামি পাথর আর তেমন পাওয়া যায় না। খাটুনি পােষায় না। বেশির ভাগ অনুসন্ধানকারী চলে গেল। শুধু মঙের মতাে কয়েকজন মাটি কামড়ে পড়ে রইল। রক্তে যাদের নেশা লেগেছে। রত্নপাথর খোঁজার সর্বনাশা নেশা।
পুরনাে লােক, মঙের বন্ধু বান্ধবেরা আজ কেউ নেই। তবে এখনও প্রতিবছর কিছু কিছু নতুন লােক আসে এ অঞ্চলে। কয়েক বছর খোঁজে। কেউ কিছু কিছু পায়। কেউ কিছুই পায় না। তারপর তারা চলে যায়। বেশিদিন থাকে না কেউ। | মঙ ভাবে, আর না। এবার ফিরে যাই। দেশে তার দু'মুঠো ভাতের অভাব হবে না। কিন্তু হতাশ মনে পরাজিত হয়ে ফিরতে তার আঁতে লাগে। যদি তেমন কিছু পাই তাে ফিরব, নইলে নয়।
মঙ একটা দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে উঠে দাঁড়াল। রােদ বেশ চড়া হয়ে উঠেছে। পাথর তাতছে। ঘরে ঢুকে সে কৌটো, হাঁড়িকুড়িগুলি নেড়েচেড়ে দেখল চারমুঠো চাল অবশিষ্ট আছে আর এক ফালি কুমড়াে। অর্থাৎ মাত্র একবেলার আহার। থাক, এখন রান্না করব না, রাতে খাব। আসছে দিনের ভাবনা মঙের মাথায় আসে না। যা হয় হবে। শুধু লী কেন, অন্য কোনাে লােক তাকে আর ধার দেবে না। অনেকের কাছেই তার প্রচুর ধার জমেছে। শেষে ভরসা ছিল লী, তাও গেল। বাধ্য হয়ে আবার হয়তাে তাকে মজুরি খাটতে হবে। কিন্তু বুড়াে বয়সে হাড়ভাঙা খাটুনি আর শরীরে সয় না।
খাবার চিন্তায় লীর ঠাট্টা মনে পড়ল। তার কাছে কটা টাকাই বা ধার? অথচ মঙের কৃপায় তার কম লাভ হয়নি এতদিনে। বােকা মঙকে অনেকে ঠকিয়েছে। তার অংশীদাররা। দোকানদাররা। যখন সে পাথর ভালাে চিনত না, দাম জানত না, অংশীদাররা প্রায়ই ভালাে ভালাে পাথরগুলাে ঠকিয়ে নিয়েছে। ওই লী কতবার দামি পাথর নামমাত্র দামে কিনেছে তার কাছ থেকে। আবার টাকা হাতে পেয়ে ওই লীর দোকানেই সে ফুর্তি করেছে। জিনিস কিনেছে। মাসের শেষে মােটা বিল দিয়েছে লী। একবার চোখ বুলিয়েও দেখেনি হিসেবটা। তৎক্ষণাৎ মিটিয়ে দিয়েছে সব পাওনাগণ্ডা। বন্ধুরা বলেছে ও বেটা জোচ্চোর। ঠকায়। মঙ কিন্তু কখনও লীকে কিছু বলেনি। আর আজ কি অপমানটা করল। এতটুকু কৃতজ্ঞতা নেই লােকটার।
মঙ উঠে দাঁড়াল। খনি খোঁড়ার দরকারি যন্ত্রপাতি ভরা থলিটা কাঁধে নিয়ে সে কুটিরের বাইরে বেরুল।
গ্রামের সীমানা ছাড়িয়ে মাইল খানেক দুরে পাহাড় জঙ্গলের শুরু। বনের কাছে এক গভীর গর্ত। খনির খাদান এখন ঝোপ-ঝাড়ে ঢাকা। বড় বড় গাছ গজিয়েছে চারপাশে। প্রচুর রুবি ও নীলা পাওয়া গিয়েছিল এই খাদে। মঙ বনের ভিতর ঢুকল। বনের মধ্যেও এমনি অনেক পরিত্যক্ত খনি ছড়িয়ে আছে। এক জায়গায় সে দেখল কয়েকজন লােক একটা খাদে কাজ করছে। এরা বছর খানেক হল খাদানটা খুঁড়ছে। কিছু কিছু পাথরও পেয়েছে। তবে রুবি কম, বেশির ভাগই নীলা।
এরকম দলবেঁধে কাজ করলে অনেক সুবিধে। কিন্তু মঙের দুর্ভাগ্য কেউ তাকে এখন অংশীদার নিতে চায় না। পয়সা নেই, বুড়াে। কাজেই মঙকে একা একাই কাজ করতে হয়।
তবে একা কাজ করার চেয়ে ইদানীং তাকে সবচেয়ে মুশকিলে ফেলেছে তার চোখ। তার দৃষ্টিশক্তি বেশ কমে গিয়েছে। পাথর বাছতে অসুবিধা হয়। হয়তাে বাজে পাথরের সঙ্গে দু'একটা দামি পাথরও ফেলে দেয়। কিন্তু শহরের ডাক্তারকে চোখ দেখানাে বা চশমা নেওয়ার ক্ষমতা তার নেই। তাই খুব ধীরে সাবধানে পাথর পরীক্ষা করে।
কাছে কোনাে বড় পাহাড় নেই। নিচু পাহাড় বা টিলা। পাহাড়ের গায়ে ও উপত্যকায় নানারকম গাছ গাছড়া। লম্বা লম্বা সেগুন গাছ। ঘন বাঁশের ঝাড় আর কাঁটা ঝােপই বেশি। শক্ত মাটির তলায় চুনা পাথরের স্তর। কোথাও বা কালচে কঠিন গ্রানাইটের ঢিপি। 
মঙ একটা পুরনাে খাদের পাশে থামল। কিছুদিন ধরে সে এই খাদানটার মধ্যে খুঁজছে। খাদানটা ভালাে করে খোড়া হয়নি। যারা এখানে আগে কাজ করেছিল কোনাে কারণে অনুসন্ধান শেষ না করেই চলে গিয়েছিল। ঝােপ ও লতায় অনেকটা ঢেকে গিয়েছে গর্ত।
খাদের দেওয়ালের খাঁজে খাঁজে পা রেখে মঙ সাবধানে নিচে নামল প্রায় ত্রিশ ফুট গভীর খাদ। এক জায়গায় অনেকগুলাে বড় বড় পাথরের গুঁড়ো ছড়ানাে। এগুলাে ভাঙতে হবে। ওপর থেকে এক ফালি রােদ এসে পড়ছে। তবে আলাে বেশিক্ষণ থাকবে না। মঙ তাড়াতাড়ি কাজ শুরু করে দিল।'
খস খস করে একটা আওয়াজ হতেই মঙ সতর্ক হল। কীসের শব্দ? শেয়াল, বুনাে কুকুর না সাপ? ক্ষীণ দৃষ্টি যথাসম্ভব তীক্ষ্ণ করে চারপাশে দেখল। একটা ছােট পাথরের টুকরাে হাতে তুলে নিল। দরকার হলে ছুড়বে।
নাঃ, শব্দটা থেমে গিয়েছে। পাথরটা ফেলে দিতে গিয়ে সে চমকে উঠল। পাথরের গায়ে সন্তর্পণে আঙুল বােলাল। একটা ছােট্ট নুড়ি। পাথরের গায়ে আটকে রয়েছে। তার চোখ দুটি মাঝে মাঝে বিশ্বাসঘাতকতা করলেও তার অভিজ্ঞ আঙুলের স্পর্শ কখনও ভুল করে না। সাধারণ নুড়ি নয়, কেমন মসৃণ। নিশ্চয় দামি পাথর। তাড়াতাড়ি সে হাতুড়ি ঠুকে পাথর ভেঙে নুড়িটা বের করল।
সুপুরির মতাে ছােট্ট গােল নুড়ি। হুঁ, লালচে। একটু ঘষে পরিষ্কার করে সে ভালাে করে দেখল। বাঃ, গাঢ় লাল রঙ যেন ফুটে বেরোচ্ছে। রােদের আলােয় সে নুড়িটা পরীক্ষা করল। উত্তেজনায় ধক ধক করে উঠল তার হৃৎপিণ্ড। হ্যাঁ, ভেবেছে ঠিক। টুকটুকে লাল স্বচ্ছ পাথর। পায়রার রক্তের মতাে গাঢ় লাল রঙা চুনি। যাকে বলে পিজিয়ন ব্লাড রেড রুবি। পৃথিবীর সেরা মণি। হীরের চেয়েও দামি। অতি দুর্লভ বস্তু। মনে হচ্ছে পাথরটির ঘনত্বও নিখুঁত। এখন অবশ্য তেমন উজ্জ্বল দেখাচ্ছে না। কিন্তু মঙ জানে কেটে পালিশ করলে এই পাথরের টুকরােটি অঙ্গারের মতাে জ্বলবে। আলাে পড়লে ঝিলিক দেবে।
এই রক্তরঙা চুনি কেবল উত্তর বর্মার মগােক অঞ্চলে ছাড়া পৃথিবীর আর কোথাও পাওয়া যায় না। তাও আজকাল অতি দুষ্প্রাপ্য। শৌখিন ধনীর জগতে একটি পিজিয়ন ব্লাড রেড রুবির জন্য কাড়াকাড়ি পড়ে যায়। অস্বাভাবিক দর ওঠে। ডান হাতের তালুতে চুনিটি দেখতে দেখতে মঙের সারা শরীর কাপতে থাকল। দরদর করে ঘাম ঝরে পড়ে লাগল। যেন বিশ্বাস হয় না ব্যাপারটা। বারবার ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখল, না, কোনাে ভুল নেই।
কত ওজন হবে? মঙ আন্দাজ করল প্রায় কুড়ি ক্যারেট। সময় নষ্ট না করে সে চটি পকেটে পুরে যন্ত্রপাতি থলিতে ভরে গ্রামের পথে রওনা দিল। লম্বা লম্বা পা ফেলে চলল।
মঙ সােজা বা-থিনের দোকানে এসে ঢুকল। লীর মতাে বা-থিনও হরেকরকম ব্যবসা করত। মশলাপাতি, মণিহারি জিনিস সাজানাে রয়েছে দোকানে। সঙ্গে লাগােয়া একটি ঘরে পান ভােজনের ব্যবস্থাও আছে। তাছাড়া লীর মতাে বা-থিনও মণি রত্ন কেনাবেচা করে। এসে বাথিনের সামনে টেবিলের ওপর চুনিটি রেখে মঙ বলল-“ওজন কর।
পাথরটি দেখে বা-থিন চমকে উঠল। খপ করে তুলে নিয়ে আইগ্লাস বের করে চোখে লাগিয়ে গভীর মনােযােগে পরীক্ষা করল। উত্তেজনায় তার মুখ লাল হয়ে উঠল। একটু ইতস্তত করে সে যেন অভ্যাসবশেই বলতে যায়। উঁহু, তেমন ভালাে জাতের বলে মনে হচ্ছে না তাে। কমদামি মাল।
কিন্তু মঙের ভাবলেশহীন মুখ দেখে সে নিজেকে সামলে নিল। মঙের মতাে ঝানু পাথর খুঁজিয়েকে এসব ভাওতায় ভােলােনাে যায় না বা-থিন জানত। বরং সে হাত বাড়িয়ে মঙের হাত চেপে ধরে বলল, –‘অভিনন্দন মঙ। খুব ভালাে জিনিস পেয়েছ। খাটি মাল।
মঙ আবার নিস্পৃহ স্বরে বলে, ‘ওজন করাে।
হা, হা করছি। বা-থিন চটপট দাঁড়িপাল্লা বের করে। ‘, যা ভেবেছিল ঠিক। একুশ ক্যারেট। 
দাম কত?’ মঙ একই সুরে বলল।
বা-থিন কাগজ কলম বের করে নানারকম অঙ্ক কষতে লাগল। কিন্তু মঙ ততক্ষণে মনে মনে একটা হিসাব কষে ফেলেছে। ‘পনেরাে হাজার টাকা। বাথিন বলল।
মঙ হাত বাড়াল। পাথর দাও।'
সে কি। বা-থিন আঁৎকে ওঠে। –‘ভাবছ বুঝি ঠকাচ্ছি। বেশ আরও দু’হাজার দিচ্ছি।
-না। পাথর দাও। এখন বিক্রি করব না।
-বেশ বেশ! তাড়াহুড়াের কী আছে। পাথর দিচ্ছি। তা দু’দণ্ড বসাে তাে। ওরে কে আছিস। দুটো মাংসের চপ নিয়ে আয়, আর চর্বির বড়া। গরম গরম আনবি।
মঙ নির্বিকার ভাবে চা ও চপ খেল। তারপর চুনি পকেটে পুরে বেরিয়ে এল। বা-থিন পিছন পিছন এল।
-দেখ মঙ আমি তােমার কদ্দিনকার খদ্দের। কখনও ঠকিয়েছি তােমায়? জানি তুমি অন্য দোকানে যাবে দর যাচাই করতে। বেশ, অন্যরা যা বলে আমিও ঠিক তত দিতে রাজি! মনে রেখাে কথাটা।
লী হঠাৎ মাথা তুলে টেবিলের সামনে মঙকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে ভ্রু কুচকালো। প্রায় মুখ ফসকে বেরিয়ে যাচ্ছিল—“তারপর কী? বললাম তাে ধারটার হবে না। কিন্তু মঙের হাবভাব দেখে একটু অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল। মঙ গম্ভীরভাবে চুনি বের করে টেবিলে রাখল।—‘ওজন করাে! কত দাম হবে।
পাক্কা জহুরি লী পাথরটি এক নজরে দেখেই চিনতে পারল। একটু পরীক্ষা করেই কোনাে সন্দেহ রইল না তার। উত্তেজনায় তার চোখ বড় বড় হয়ে উঠল—‘আঁ, আজই পেলে বুঝি এটা।'—হু। মঙের সংক্ষিপ্ত জবাব।
অনুশােচনায় লী নিজের চুল ছিড়তে ইচ্ছে হয়। এই লােকটাকে সে আজ সকালে অপমান করে তাড়িয়ে দিয়েছে আর এখন? যদি মঙ প্রতিশােধ নেয়? যদি তাকে এই চুনি বিক্রি করতে না চায়? ইস, বহুদিন এমন ভালাে লাভের সুযােগ আসেনি তার ভাগ্যে। এই রক্তরঙা চুনি বিদেশি ধনীর কাছে বিক্রি করে মােটা দাও আয় করা যাবে। লী তৎপর হয়ে উঠল। চেয়ার ছেড়ে লাফিয়ে উঠে ছােকরা কর্মচারীটির উদ্দেশে হাঁক ছাড়ল, এই ব্যাটা, হাঁ করে দাঁড়িয়ে দেখছিস কী? ভদ্রলােককে বসার টুল দে। আর দেখ কী কী খাবার পাওয়া যায়। যা যা টাটকা পাবি আনবি।
তারপর বলল, ‘হেঁ হেঁ, বুঝলে মঙ। তােমার সৌভাগ্য উপলক্ষে একটু খাওয়া-দাওয়া না করলে কি চলে? লী দাঁত বের করে হাসতে লাগল।
মঙ প্লেটভর্তি খাবারের সদগতি করতে করতে বলল, কই, ওজন করলে না? দামটা হিসেব করাে।
- ‘হা করছি। তাড়া কীসের। আগে খাও।
- সতেরাে হাজার টাকা। দামটা বলে ফেলে লী আড় চোখে মঙকে লক্ষ করে। উঁহু, মনে হচ্ছে পছন্দ হয়নি দামটা। তাড়াতাড়ি বলল – “আচ্ছা, আঠারাে হাজার দেব। কি, চলবে?
মঙ মুখ মুছতে মুছতে হাত বাড়ায়—আমার পাথর দাও।
লী শশব্যস্ত হয়ে বলে, “কি পােষালো না। বেশ আর এক হাজার দিচ্ছি—উনিশ। এর বেশি কেউ দেবে না। তুমি যাচাই করতে পার। আরে! তােমায় কি আমি ঠকাব? আমাদের কি কেবল লাভ-লােকসানের সম্পর্ক। আঁ? তুমিই বলাে?
মঙ মাথা নাড়ল। ‘পাথর দাও, এখন বেচব না। লী হতাশ ভাবে বলল, ‘বেশ, আরও এক হাজার দিচ্ছি। এবার খুশি? মঙ কথা না বাড়িয়ে চুনি হাতে নিয়ে উঠে দাঁড়ায়।
লী হাত কচলাতে কচলাতে রাস্তার মোড় অবধি সঙ্গে চলল। মনে করিয়ে দেয় তাদের কতদিনের বন্ধুত্ব। কতদিনের কারবার। হা, সকালের ব্যাপারটায় ভাই রাগ করাে না। মাথা ঠিক ছিল না আমার। একটা মােটা লােকসানের খবর পেলাম আজ সকালেই। সর্বনাশ হয়ে গেছে ব্যবসার। নইলে কি ওই সামান্য কটা টাকার জন্যে তােমায় তাগাদা দেই? এতোদিন তাে দেখছ আমায়। তুমিই বলাে।
মঙ উত্তর না দিয়ে এগিয়ে গেল।
পথে যার সঙ্গে মঙের দেখা হয় সেই সেধে সেধে কথা বলে। যারা এতদিন, " হে বুড়াে' ইত্যাদি ভাষায় তাচ্ছিল্যের সঙ্গে কথা বলেছে, তারাই 'ওহে মশাই' বলে সম্ভোধন করতে লাগল। মুখে তাদের সমীহ। প্রথমটায় মঙ অবাক হয়ে গেলেও কিছুক্ষণ পরে রহস্যটা ধরতে পারল। —অর্থাৎ খবরটা রটে গিয়েছে।
তার কুটিরের ভিতর ঢুকে স্থির হয়ে বসল। হুম, এখন কী করা যায়? নাঃ ক্ষিদে নেই।

লী ও বা-থীনের কল্যাণে পেট ভর্তি। ঘুম পাচ্ছে। সারাদিনের খাটুনি ও উত্তেজনা শরীর অবসাদে জড়িয়ে আসছে। কিন্তু এই নির্জন ভাঙা ঘরে ঘুমনাে কি ঠিক হবে। দুষ্ট লােকের অভাব নেই। সে বৃদ্ধ, দুর্বল। কেউ যদি জোর করে চুনিটা কেড়ে নেয় বা ঘুমের মধ্যে চুরি করে? এ চুনি সে এখানে বিক্রি করবে না। মান্দালয় শহরে নিয়ে যাবে। সেখানকার রিদের সঙ্গে দরদত্তর করলে তার দৃঢ় বিশ্বাস আরও কয়েক হাজার টাকা বেশি পাওয়া যাবে।
ভেবেচিন্তে মঙ কুটির ছেড়ে বেরিয়ে জঙ্গলের পথে হাঁটা দিল।
মঙ কোথায় আত্বগােপন করেছিল, কোথায় সে ঘুমিয়েছিল কেউ জানে না। কিন্তু ঘণ্টা তিনেক পরে সে যখনই গ্রামে আবির্ভূত হল তাকে দেখে সবাই হতভম্ব।
উসকো খুসকো চেহারা। চোখ লাল। পাগলের মতাে চেঁচাচ্ছে এবং হাতে এক মস্ত ধারালাে কাটারি।
কী ব্যাপার! ব্যাপারটা অচিরেই জানা গেল। মঙ জঙ্গলের ভিতর ঘুমিয়েছিল। সেই সময় কেউ নাকি তার চুনি চুরি করেছে।
মঙ উন্মাদের মতাে পথে পথে ছুটে বেড়াতে লাগল। যাকে দেখে ভয়ঙ্কর ভাবে কাটারি তুলে তেড়ে যায়।
-বলাে, কে চুরি করেছে আমার পাথর? নিশ্চয় জানাে। বুঝেছি ষড়যন্ত্র। বেশ আমিও দেখে নেব কেমন করে সে আমার হকের ধন হজম করে। ঠিক খুঁজে বের করব সেই শয়তানকে। আমি তাকে খুন করব।'
গ্রামের লােক মঙের সেই বিভীষণ মূর্তি দেখে যে যার ঘরে ঢুকে দরজা আটকে দিল। চুনির শােকে বুড়াের মাথা ঠিক নেই। কী জানি কী করে বসে।
মঙকে ছুটে আসতে দেখে লী ঝটপট দোকানের ঝাপ ফেলে ভিতরে বসে বসে ঠকঠক করে কাপতে লাগল। মঙ বাইরে থেকে তারস্বরে চেঁচাল ‘বুঝেছি, এ তাের কীর্তি লী! ভালােয় ভালােয় পাথর বের করে দে, নইলে এর শােধ আমি তুলব।'
লী কোনাে সাড়াশব্দ দিল না। সেখান থেকে মঙ ছুটল বা-থিনের উদ্দেশে। বা-থিন অবশ্য আগে থেকেই খবর পেয়ে দোকান বন্ধ করে সরে পড়েছিল!
মঙ অনেকক্ষণ এইভাবে চেঁচামেচি ও আস্ফালন করে তার কুটিরে ফিরে গেল। তার চুনির কিন্তু কোনাে হদিশ মিলল না।
গ্রামে তাে বেজায় হুলস্থুল। কে চুরি করল মঙের চুনি?
একদল বলল, এ নির্ঘাৎ বেঁটে চ্যাং-এর কীর্তি। লােকটা দাগি চোর এবং অনেকে তাকে মঙের পিছন পিছন যেতে দেখেছে। আরএক দলের রায়, এটি ফুজির হাত সাফাই। বিকেল বেলা ও বনে ঢুকেছিল কী করতে!
ফুজি ও চ্যাং দু'জনেই গুজব কানে যাওয়া মাত্র দৃঢ়ভাবে সব অভিযােগ অস্বীকার করল। তাছাড়া তাদের বিরুদ্ধে প্রমাণও কিছু নেই। হাতে নাতে কেউ ধরেনি। মঙও বলতে পারছে না কে নিয়েছে।
নী ও বা-থিনের মতাে ব্যবসায়ীরা দারুণ ঘাবড়ে গেল। ছি ছি কী কাণ্ড! এরকম চুরি-চামারি হলে ব্যবসা চলে কী ভাবে! যে চুরি করেছে, সে তাে পাথরটা নিয়ে সটকাবে এবং অন্য কোথাও বেঁচবে। এতে এই পাথর কেনাবেচা করে তারা যে লাভটুকু করত সেটি মাঠে মারা গেল।
লী বেঁটে চ্যাং-এর এক সাগরেদকে পাকড়ে মিষ্টি মিষ্টি করে শােনাল।–দেখ ভাই, কেউ যদি একখানা ভালাে চুনি বিক্রি করতে চায় তাে আমার কাছে পাঠিও! উচিত দাম দেব! হ্যা, পাথর সে কোত্থেকে পেয়েছে! কেমন করে, এসব নিয়ে আমি বিন্দুমাত্র মাথাই ঘামায় না! আর কথা দিচ্ছি যেই বিক্রি করুক না কেন, তার নাম আমি গােপন রাখব।
ইতিমধ্যে বা-থিনও একই বার্তা প্রচার করেছিল!!
মঙ সে রাত কেমন করে কাটাল কেউ খোঁজ করেনি। খোজ করার সাহসও ছিল না কারও। যাহােক পরদিন সকালে তাকে দেখা গেল নদীর ঘাটে বসে আছে। 
সেদিন মান্দালয়গামী স্টিমার আসার দিন। ইরাবতী নদীপথে যাত্রী ও মালপত্র নিয়ে স্টিমার আসা যাওয়া করে। তবে রােজ নয় কয়েকদিন অন্তর অন্তর। স্টিমার গ্রামের ঘাটে থামে। এখান থেকে তাড়াতাড়ি শহরে যাওয়ার বা আসার এই একমাত্র উপায়। নইলে নৌকোয় বা ডাঙাপথে অনেক বেশি সময় লাগে। 
স্টিমার এল। মঙ ছাড়াও ঘাটে আর কয়েকজন যাত্রী ছিল। সবাই উঠল। গ্রামের লােক কৌতূহলী হয়ে বার বার জিজ্ঞেস করতে লাগল—“মঙ, কোথায় চললে?
অনেকক্ষণ পর মঙ চিৎকার করে উত্তর দিল-“থানায়
এখান থেকে ঘন্টাখানেক স্টিমারে গেলে থানা। ওই থানার দারােগার ওপর এ অঞ্চলের আইনশৃঙ্খলা রক্ষার ভার। 
ডেকের এক কোণে মঙ কাঠের মতাে খাড়া বসে রইল। তার তীব্র উদ্ভ্রান্ত দৃষ্টি জলের দিকে নিবদ্ধ। যাত্রী ও মাল্লারা ফিসফিসিয়ে তার দুর্ভাগ্য নিয়ে আলােচনা করতে লাগল কেউ অবশ্য তার কাছে ঘেঁষল না। এমনকী তার কাছে স্টিমারের টিকিট অবধি চাইতে গেল না কেউ।
থানার ঘাটে স্টিমার ভিড়তেই মঙ লাফ দিয়ে ডাঙায় নামল। সারেংকে আদেশ দিল—“খবরদার, কাউকে নামতে দেবে না। আমি পুলিশ ডাকছি। তল্লাশি হবে। 
থানার দারােগা মঙের নালিশ শুনে বলল, তাইতাে, খুবই দুঃখের ব্যাপার। তােমার এত বড় লােকসান হল। নাঃ, গ্রামের বদমাশগুলাে বড় জ্বালাচ্ছে। একবার আচ্ছা করে কড়কে না দিলে চলছে না। তবে এখন লঞ্চে তল্লাশি করে কিসসু ফল হবে না। যে চুরি করেছে সে কি আর এই স্টিমারে চড়েছে। মনে হয়, সে আপাতত গ্রামেই আছে। পরে সুযােগ বুঝে পালাবে। আমি বরং গ্রামে সেপাই পাঠাচ্ছি। কিন্তু চুনি ফিরে পাওয়ার আশা কম যেহেতু কে নিয়েছে যখন দেখতে পাওনি।
মঙ নাছােড়বান্দা। নিশ্চয় ওই গ্রাম থেকে যারা আসছে তাদের মধ্যে কেউ চুরি করেছে আমার চুনি। তাদেরই কারও কাছে আছে। তাড়াতাড়ি শহরে চলেছে বিক্রি করতে।
অগত্যা বাধ্য হয়ে দারােগা উঠল। নইলে যে বুড়াে নড়বে না। মঙের সঙ্গে আরাে আটজন লােক ওই গ্রামের ঘাট থেকে স্টিমারে উঠেছিল। তাদের জামা কাপড় জিনিসপত্র তন্নতন্ন করে খুঁজেও হারানাে চুনির পাত্তা পাওয়া গেল না। বিরক দারােগা সেপাইদের নিয়ে ফিরে গেল। সবার আগে দারােগা মঙকে জিজ্ঞেস করল, এখন কী করবে?
-জানি না। মঙ উত্তর দিল। এই স্টিমারেই যাবে?-হ্যাঁ
থানার এক সিপাই ছুটি নিয়ে শ্বশুরবাড়ি যাচ্ছিল ওই স্টিমারে। দারােগা তাকে ডেকে-লোকটার ওপর একটু নজর রেখাে। শেষে আত্মহত্যা না করে বসে। তাহলে আরও ভােগাবে আমায়।
মঙ ডেকের কোণে গিয়ে বসেছে। তার মাথা সামনে ঝুঁকে পড়েছে। ডান হাতের তালু মুখের ওপর চাপা। সমস্ত ভঙ্গিতে চরম হতাশা ও রিক্ততার ভাব। মঙের অবস্থা দেখে অন্যদের দুঃখ হচ্ছিল। তবে তার গ্রামের সঙ্গী ক’জন বেজায় চটেছে। তারা দূর থেকে মুণ্ডপাত করছিল বুড়াের। মঙের অবশ্য কোনাে খেয়াল নেই। নিজের চিন্তায় ডুবে আছে।
মান্দালয়ে স্টিমার থামতে মঙ নামল। সিপাইটি দারােগার কথামতাে কিছুক্ষণ মঙকে চোখে চোখে রেখেছিল। কিন্তু জাহাজ ঘাটায় ভিড়ের মধ্যে হঠাৎ করে মঙ যেনো কোথায় হারিয়ে গেল। সিপাইটির তাড়া ছিল। একটা ক্ষ্যাপা বুড়াের পিছনে বাজে সময় নষ্ট না করে সে ছুটল শ্বশুরবাড়ি যাওয়ার নৌকো ধরতে।
আরও দু'দিন পরে।
দুপুরবেলা এক নির্জন মাঠের ধারে মঙ বাস থেকে নামল। একজন লােক সেই বাসে উঠবে বলে দাঁড়িয়েছিল। মঙকে দেখে চেঁচিয়ে বলল—“আরে মঙ যে, অনেক কাল পর। থাকবে তাে কিছুদিন?
হ্যাঁ ভাই, এবার দেশেই থাকব ঠিক করেছি। আর ফিরব না। মঙ হাসিমুখে উত্তর দিল। ‘বেশ বেশ। পরে দেখা হবে, গল্প হবে। বলতে বলতে লােকটি চলন্ত বাসে উঠে পড়ল। মঙ একা দাঁড়িয়ে রইল।
দূরে মাঠের ওপারে গাছপালা ঘেরা তার নিজের গ্রামটির দিকে তাকিয়ে মঙ একটা তৃপ্তির নিশ্বাস ফেলল। প্যান্টের পকেটে হাত ঢুকিয়ে সে বের করল একটি থলি। থলিটা টিপেটুপে দেখল। আঃ, নােটে ঠাসা। কড়কড়ে পঁচিশ হাজার টাকা। মান্দালয়ে চুনি বিক্রি করে পেয়েছে। 
একটু হিসাব করে চললে এখন বাকি জীবনটা পায়ের ওপর পা তুলে আরামে কাটাব।” মঙ নিজের মনে বলল। “মঙ বােকা, চিরকাল কেবল ঠকেই এসেছে। তাই না? এখন কেমন? চোর ডাকাতকে ফাঁকি দিলাম এবং অতগুলাে পাওনাদারকে বেবাক কলা দেখালাম। কাউকে একটি পয়সা ধার শােধ করতে হল না।
দারােগাকে মঙ নিছক মিথ্যে কথা বলেনি। স্টিমারে ওই গ্রামের যাত্রীদেরই কারও কাছে ছিল তার চুনি। তবে লােকটি যে স্বয়ং মঙ তা কে ভাববে!

(বিদেশি গল্পের ছায়া অবলম্বনে)

No comments

Theme images by Jason Morrow. Powered by Blogger.