মেলায় ঝামেলা - অজেয় রায় Melay Jamela by Ajeo Ray


বিকেল পাঁচটা নাগাদ বঙ্গবার্তার অফিসে একবার ঢু মারল দীপক। ভবানী প্রেসের এক অংশে কাঠের পার্টিশন ঘেরা ছােট্ট কুটুরি। তারই ভিতর বসেন সাপ্তাহিক বঙ্গবার্তা পত্রিকার সম্পাদক শ্রীকুঞ্জবিহারী মাইতি। ভবানী প্রেসেরও মালিক মাইতিমশাই। বছর পঁচিশেকের যুবক দীপক রায় বঙ্গবার্তার একজন সাংবাদিক। কাজটা তার শখের বলা চলে। কারণ সাংবাদিকদের পারিশ্রমিক দেওয়ার সাধ্য নেই বঙ্গবার্তার, বড়জোর মাঝে-মাঝে দু-চার টাকা গাড়ি ভাড়া মেলে।

কুঞ্জবিহারী চেয়ারে হেলান দিয়ে দ হয়ে বসে। সামনে টেবিলের ওপর দু-ঠ্যাঙের অর্ধেক ছড়ানাে। চোখ আধবােজা। ডান হাতের আঙুলে ধরা খােলা ডটপেন। টেবিলে বিছানাে কয়েক পাতা ফুলস্কেপ সাদা কাগজ। আগামী সপ্তাহের জন্য একটি জ্বালাময়ী সম্পাদকীয় ভাবছেন।
ক্যাঁচ। সুইং-ডােরে মৃদু আওয়াজে চোখ খুললেন কুঞ্জবিহারী। দীপক মুন্ডু বাড়িয়েছে দরজা ঠেলে। সম্পাদককে চিন্তামগ্ন দেখে সে কিঞ্চিৎ অপ্রতিভ হয়ে বলল, ঠিক আছে। পরে আসব, এই এমনি এসেছিলাম।
অন্যমনস্কভাবে দীপকের পানে কয়েক পলক তাকিয়ে থেকে কুঞ্জবিহারীর থমথমে মুখে খুশির আভা ফোটে। সােজা হয়ে বসতে বসতে বললেন, এসাে দীপক, তােমার কথাই ভাবছিলাম আজ। কাজ আছে।
দীপক ঘরে ঢুকে সম্পাদকের সামনে বসল চেয়ারে।
কুঞ্জবিহারী মাঝবয়সি। দৃঢ়কায় শ্যামবর্ণ। বেটেখাটো। গোলগাল চোখে প্রখর দৃষ্টি। মাইতিমশাই বাজখাই গলায় প্রশ্ন করলেন, পাথরচাপুড়ির মেলায় গেছ কখনাে?
-না। ঘাড় নাড়ে দীপক। কিছু জান মেলাটা সম্বন্ধে ? কোথায় হয়? কী উপলক্ষে?
দীপক আমতা আমতা করে, সিউড়ি শহর থেকে খানিক দূরে হয় শুনেছি। কোনাে এক ফকিরের নামে। আর কিছু ঠিক--সে চুপ করে যায়।
-সিউড়ি থেকে মাইল পাঁচ-ছয় দূরে পাথরচাপুড়ি গ্রামের পাশে মেলা বসে, জানালেন কুঞ্জবিহারী, মেলার হিস্ট্রিটা ইন্টারেস্টিং। প্রায় দেড়শাে বছর আগে এক মুসলমান ফকির এসে পাথরচাপুড়ি গ্রামে বাস করতে থাকেন। ফকিরের নাম ছিল বােধহয় মহবুব শাহ। কিছু অলৌকিক ক্ষমতার গুণে এবং দাতা হিসেবে তিনি বিখ্যাত হন। ভক্তদের থেকে যা পেতেন সব বিলিয়ে দিতেন গরিব-দুঃখীদের। লােকে তাকে তাই নাম দেয় দাতাসাহেব। ১৮৯৮ সালে দাতাসাহেব ওইখানেই দেহত্যাগ করেন। তার মৃত্যুবার্ষিক উদযাপন উপলক্ষে ১৯১৮ সাল থেকে এখানে মেলা বসতে শুরু করে। ১০ চৈত্র দাতা সাহেবের মৃত্যুদিন। সেইদিন মেলা শুরু হয়। অফিসিয়ালি তিন দিন থাকে। অবশ্য ভাঙতে আরও দিন দুয়েক কেটে যায়। প্রথম দিকে ছােটো মেলা ছিল। এখন বিরাট ব্যাপার। প্রচুর লােক আসে। অনেক দোকানপাট বসে। হিন্দু মুসলমান সব ধর্মের লােক যায় মেলায়। আশেপাশের অন্য জেলা থেকেও লােক যায়। ভক্তরা দাতাসাহেবের সমাধি দর্শনে যায়। আমি প্রায় কুড়ি বছর আগে একবার গিয়েছিলাম পাথরচাপুড়ির মেলায়।
আজ ১০ চৈত্র। অর্থাৎ আজ থেকে মেলা শুরু হল। পারলে চলে যাও। ঘুরে দেখে এসে লেখ মেলাটার বিষয়ে। স্পেশাল পয়েন্টগুলাে নােট করবে। আর যদি—কুঞ্জবিহারী মুহূর্ত থেমে একবার ভ্রু নাচালেন, তেমন কোনাে ঝামেলা, মানে ইয়ে কোনো ইন্টারেস্টিং অভিজ্ঞতা হয়ে যায়, স্টোরিটা জমে যাবে।
-সিউড়ি গিয়ে বাস চেঞ্জ করে পাথরচাপুড়ি? দীপক জানতে চায়।
-আমি তাই গিয়েছিলাম। তবে এখন কিছু বাস এই বােলপুর থেকেই সােজা পাথরচাপুড়ি অবধি যায় মেলার সময়। জানালেন কুঞ্জবিহারী।
-ঠিক আছে যাব কাল। দীপক বিদায় নিল।
দীপক পাথরচাপুড়ির মেলায় যাবে শুনে তার দুই ভাইপাে ভাইঝি ষােলাে বছরের ছােটন আর চৌদ্দ বছরের ঝুমা আবদার জুড়ল, কাকু, আমরাও যাব তােমার সঙ্গে। 
দীপক ভেবে দেখল, মন্দ নয়। একা একা ঘুরে ব্যাজার হব। এরা দুটোই খুব চালাক চতুর। তার নিজের কাজে বাধা হবে না। বরং গল্পগুজব করে সময়টা ভালােই কাটবে। তবু সে ওদের একটু সাবধান করে দেয়, নিয়ে যেতে পারি তবে বেশি ছটফট করা চলবে না। আমার চোখে চোখে থাকতে হবে। শেষে লােকের ভিড়ে হারিয়ে গেলে খুঁজে মরব তা হবে না।
-না না কাকু, একদম তােমার লেজ ধরে থাকব। ঝুমা সরবে জানায়।
-কী বললি? কী ধরে থাকবি? দীপক চোখ পাকাতেই ঝুমা জিভ কাটে। অমনি ছােটন কাকাকে উসকোয়, দরকার কি ওকে নেবার। মেলার ভিড়ে মেয়েদের নিয়ে যাওয়া ভারি ঝামেলা।
-থাক থাক তােমার আর আমার ঝামেলা বইতে হবে না, ঝুমা ফোস করে, কাকু নেবে আমায়? তার চোখ ছলছল।
দীপক তাড়াতাড়ি বলে, বেশ বেশ যাবে দু’জনেই। এবার তার আদরের ভাইঝির মুখে হাসি ফোটে।
দুপুর দুটো নাগাদ ছােটন ও ঝুমাকে নিয়ে দীপক পাথরচাপুড়ি পৌঁছল। একা এলে সে সকালেই আসত। কিন্তু ছােটন ঝুমা থাকায় দুপুরের খাওয়াটা সেরে এসেছে। মেলায় কোথায় আবার ভাত খাবে ওদের নিয়ে? এরপর বাসের জন্য অনেকক্ষণ অপেক্ষা করতে হয়েছে। পথে আবার বাস বিগড়েছিল। এই সব কারণে মেলায় পৌঁছতে দেরি হয়ে গেল তাদের। বাস যেখানে থামে সেখান থেকে মেলায় ঢুকতে মিনিট পাঁচ সাত হাঁটতে হয়। বাস থেকে নেমে দীপক থ। এ মেলায় এত ভিড় হয় সে ভাবতে পারেনি। জনস্রোত বইছে দুমুখাে। একদল ঢুকছে মেলায়, অন্যরা বেরিয়ে আসছে। চৈত্রে মেঠো পথে-যাত্রীদের পায়ে গুড় গেরুয়া ধুলােয় মেলার আকাশ কিছুটা ঘােলাটে। নানান বয়সি লােকের কেতাদুরস্ত মানুষ কম। বেশির ভাগই গ্রাম অঞ্চলের গরিব মধ্যবিত্ত মানুষ। বাস স্ট্যান্ডের আশেপাশে গরুর গাড়ি রয়েছে অন্তত শ'খানেক। বেশির ভাগ গাড়ির জোয়াল নামানো, মুখ থুবড়ে রয়েছে। পাশে দাঁড়িয়ে গরুগুলি জাবর কাটছে। গাড়ির কাছাকাছি বসে রান্না করছে বা বিশ্রাম নিচ্ছে অনেক আরোহী। চার-পাঁচখানা প্রাইভেট মােটরগাড়ি এবং কয়েকটা লরি দেখা গেল দাঁড়িয়ে আছে।
তিনজনে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখে। একটার পর একটা মিছিল আসছে নানারকম বাজনা বাজাতে বাজাতে। ঢুকে যাচ্ছে মেলায়। প্রত্যেক মিছিলের সঙ্গে ট্রলি-রিকশা বা ঠেলাগাড়ি বা ঠেলার ওপর বিছানাে সুন্দর সুন্দর চাদর। চাদরের ওপর ছড়ানাে রয়েছে কখানা নােট আর খুচরাে পয়সা। গাড়িগুলিতে আরও কীসব পোটলাপুঁটলি। মিছিলের লােকের হাতেও পোঁটলা, তাছাড়া সঙ্গে নিয়ে চলেছে ছাগল মুরগি খাসি ইত্যাদি।
-এত মিছিল কোথায় যাচ্ছে কাকু? জিজ্ঞেস করে ঝুমা। দীপক পাথরচাপুড়ির মেলা সম্বন্ধে কিছু খোঁজখবর নিয়ে এসেছিল। তাই জবাবটা আটকাল না। বলল, এরা ভক্তশ্রী যাচ্ছে, দাতাসাহেবের মাজার অর্থাৎ সমাধি দর্শন করতে। সেখানে প্রণাম করবে আর টাকাকড়ি সিন্নি নানারকম রান্না খাবার, তাছাড়া মােরগ খাসি ছাগল এইসব উৎসর্গ করবে। শুনেছি নগদে ঐ জিনিস মিলিয়ে প্রায় লাখখানেক টাকার মতন জমা পড়ে দাতাসাহেবের নামে এই মেলার কদিনে। এবার মেলায় ঢুকি। দীপক এগােলাে। 
মেলায় ঢোকার মুখেই এক অদ্ভুত দৃশ্য। পায়ে চলা হাত দশেক চওড়া ধূলিধূসর কাচা রাস্তার দু'ধারে সার দিয়ে রয়েছে কয়েক শো ভিখিরি। কানা খোঁড়া রোগগ্রস্ত কে নেই। নানান বয়সি পুরুষ ও নারী ভিখিরির কেউ বসে, কেউবা মাটিতে শুয়ে। কেউ বিকট চিৎকার করে ভিক্ষে চাইছে। কেউ বা মৃদু কাতর স্বরে সাহায্য প্রার্থনা করছে। ভিক্ষুকদের বেশির ভাগেরই চেহারা করুণ বীভৎস। এই দৃশ্য দেখে ঝুমা তাে একদম দীপকের গা ঘেঁষে এল। ভিখিরিদের সামনে রাখা বাটি, থালা, চটেতে পয়সা পড়ছে মন্দ নয়। বােঝা যায় দাতাসাহেবের কাছে আগমন উপলক্ষে যাত্রীরা উদার হস্তে দান করে গরিব দুঃখীদের। 
দীপক মেলায় ঢুকে প্রথমে যেটা দাতাসাহেবের সমাধি সেটা দর্শন করল। সুন্দর তবে আড়ম্বরহীন মাঝারি আকারের বাড়িটি। এর ভিতরে আছে দাতাসাহেবের কবর। মাজারের ভিতরে বাইরে বেজায় ভিড়। খানিক দূর থেকে অল্পক্ষণ মাজার দেখে দীপক ভাইপাে ভাইঝিকে নিয়ে মেলায় টহল দিতে লাগল।
বীরভূমে আর পাঁচটা মেলার মতন এখানেও সার্কাস ম্যাজিক নাগরদোলা চিড়িয়াখানা ফোটো তােলার স্টুডিও ইত্যাদি এসেছে। হরেকরকম দোকানপাট। খাবার দোকান প্রচুর। দীপক মাঝে মাঝে কোনাে দোকানদার বা কোনাে যাত্রীর সঙ্গে কথা বলে মেলাটা সম্বন্ধে খোঁজ নিতে লাগল।
যেতে যেতে ঝুমা বলল, কাকু, দেখেছ, এখানে কত বাতাসার দোকান।
ব্যাপারটা দীপকেরও নজরে এসেছিল। এক দোকানিকে জিজ্ঞেস করে তারা জানতে পারল যে দাতাসাহেবের ভক্তরা অনেকেই বাতাসা কিনে মাজারে প্রণামী দেয়। তাই এখানে বাতাসার চাহিদা খুব।
ঘুরতে ঘুরতে হঠাৎ মন্টুর মুখােমুখি হল দীপক। মন্টু ওরফে তারাপদ গড়াই সমাচার পত্রিকার সাংবাদিক। সমাচারও সাপ্তাহিক সংবাদপত্র। বােলপুর থেকে প্রকাশিত হয় এবং বঙ্গবার্তার প্রবল প্রতিদ্বন্দ্বী। মন্টু দীপকেরই বয়সি। তার কাঁধে ব্যাগ ও ক্যামেরা।
-মেলা কভার করতে বুঝি? মন্টু বাঁকা হেসে দীপককে জিজ্ঞেস করে।
-মানে এই বেড়ানাে আর রিপােটিং দুই। আগে দেখিনি এই মেলা। এরাও ধরল খুব। দীপক তার ভাইপাে ভাইঝিদের দেখায়।
-কখন এলে?
-একটু আগে।
-এঃ দেরি করে ফেললে। আমার তাে প্রায় কাজ শেষ। একটু বাদেই ফিরে যাব, জানায় মন্টু। মেলা অফিসে গিয়েছিলে?
-যাব। মন্টুকে এড়িয়ে এগােয় দীপক।
মেলা কমিটির প্রৌঢ় সেক্রেটারি ভ্রু কুঁচকে জানালেন—কোথাকার কাগজ বললেন, বােলপুর? বােলপুরের কাগজকে দিলাম তাে সব স্টাটিক্টিস। ফের কেন?
দীপক বুঝল যে সেক্রেটারি সাহেব মন্টুর কথা বলছেন। সে বলল, আগে যার সঙ্গে কথা বলেছেন সে বােলপুরের বটে তবে অন্য কাগজের রিপাের্টার। আমি বঙ্গবার্তা থেকে আসছি।
-ও! সেক্রেটারি এবার একটা টেবিলের ড্রয়ার খুলে কয়েকটা কাগজ বের করলেন, তাতে টাইপ করা এবং হাতে লেখা নানান ফিরিস্তি। কাগজগুলাে দীপকের সামনে ফেলে দিয়ে তিনি বললেন, এতে সব হিসেব আছে। কত দোকান এসেছে। কী কী টাইপ। সার্কাস ম্যাজিক এই সব কটা। গতকাল, আন্দাজ কত লােক এসেছে মেলায়। মেলা কমিটির ফাংশন। কত গেস্ট রাখার ব্যবস্থা হয়েছে। বলুন কী কী চান?
কাগজগুলাের ফিরিস্তিতে চোখ বােলাচ্ছে দীপক, সেক্রেটারি বললেন, ফোটো তুলবেন না ?
-ফোটো! দীপক অবাক।
-হ্যাঁ। আগের রিপাের্টার তাে আমাদের মেলা কমিটির ফোটো নিলেন তাদের কাগজে ছাপবেন বলে? জানান সেক্রেটারি।
দীপক জানে বঙ্গবার্তার মতােই সমাচারেও কোনোকালে ফোটো ছাপা হয় না। কারণ খরচে পােষায় না। মন্টু ফলস্ দিয়েছে। নিজের জন্য মেলায় ফোটো তুলতে ক্যামেরা এনেছে। সমাচারের জন্য নয়। কিন্তু সে কথা তাে আর বলা যায় না এখানে। তাই সে ম্যানেজ দিতে বলল, আমাদের ফোটোগ্রাফার এবার আসতে পারেনি। পরের বছর ফোটোশুদ্ধ মেলাটা কভার করব। 
-ও। সেক্রেটারির সুরে কিঞ্চিত তাচ্ছিল্য। তিনি ব্যস্ত হয়ে উঠে পড়ে বললেন, আমি যাচ্ছি। জরুরি কাজ আছে একটা। এই সেলিম রইল, মেলা কমিটির মেম্বার। ওকে যা দরকার জিজ্ঞেস করবেন।
গাঁট্টাগােট্টা বছর কুড়ির এক যুবককে দেখিয়ে সরে পড়লেন সেক্রেটারি। দীপক সেলিমকে প্রশ্ন করল, সমাচারের রিপাের্টার কি এই সব তথ্যই নিয়েছে?
-হ্যাঁ! ঘার নাড়ে সেলিম।
-কারও ইন্টারভিউ মানে কারও সঙ্গে কথাবার্তা বলেনি?
-সেক্রেটারি সাহেবের সঙ্গে কথা বলছিলেন কী সব, আমি শুনিনি। সেলিম কাচুমাচু।
দু'চারটে দরকারি তথ্য টুকে নিল দীপক। কিন্তু এই সমস্ত খবর তাে সমাচারেও থাকবে। বাড়তি নতুন কিছু চাই। সেলিমকে খুঁচিয়ে দেখল ছেলেটার মগজ বেশ নিরেট। কেবল হেঁ হেঁ করে, মাথা চুলকায় আর সেই মেলার কাগজপত্র হাতড়ায়। তেমন নতুন কিছুই দিতে পারল না। একে বােধহয় নেহাতই গায়ে আটার জন্যে কমিটিতে ঢােকানাে হয়েছে। খানিক হতাশ হয়েই দীপক মেলা অফিস ছেড়ে ফের ঘুরতে বেরােল।
একটা ম্যাজিকের তাবুতে ঢুকল দীপক। ছােট তাবুটা প্রায় ভরে গেছে দর্শকে। একটু পরেই শুরু হবে শো। সাদা প্যান্ট ও কালাে কোট গায়ে, সরু গোফ, ব্যাকব্রাশ করা চুল, আধা-বয়সি ম্যাজিশিয়ান ভেঞ্চি দাঁড়িয়ে ছিলেন টিকিট কাউন্টারের কাছে। দীপক তাকে নিজের পরিচয় দিয়ে নােট বই ও পেন হাতে প্রশ্ন করতে লাগল। যেমন—বাড়ি কোথায়? এর আগে কি এসেছেন এই মেলায়? টিকিট বিক্রি কেমন হচ্ছে? খেলা শিখেছেন কেমন করে? ইত্যাদি। ম্যাজিশিয়ান উত্তর দিতে ইতস্তত করে বললেন, আপনি কি খেলা দেখবেন?
-দেখতে পারি, জানায় দীপক। দীপকের সঙ্গে ছোটন আর ঝুমার ওপর এক নজর বুলিয়ে নিয়ে ম্যাজিশিয়ান বললেন, দেখুন স্যার, বােলপুরের কাগজকে আর কিন্তু ফ্রি-টিকিট দিতে পারব না। তবে হাফ-ফ্রি দিতে পারি। নইলে লোকসান হয়।
দীপক বুঝল যে শ্রীমান মন্টু একে ইন্টারভিউ করে গেছে এবং বিনি পয়সায় শাে দেখেছে। সে চটে গিয়ে বলল, না না, আমাদের ফ্রি দেওয়ার দরকার নেই। দেখলে টিকিট কেটেই দেখব?
দীপক ছোটন ও ঝুমাকে জিজ্ঞেস করল, দেখবি ম্যাজিক? 
কাকার মুড বুঝে ছােটন বলে উঠল, নাঃ, এখন থাক পরে।
ম্যাজিশিয়ান ভেঞ্চিকে আপাতত বরবাদ করে দীপক বেরিয়ে এল। একটু বাদেই মন্টুর সঙ্গে আবার সাক্ষাৎ।
-কি গিয়েছিলে মেলা অফিসে? আরে ওরা শুধু মামুলি খবর দেয়। কিন্তু ইন্টারেস্টিং লােক পাকড়ে বরং ইন্টারভিউ করাে, স্টোরি জমে যাবে। মন্টু মাতব্বরি ঢঙে বলল।
-তুমি করেছ? জানতে চায় দীপক।  
-হু করেছি বইকি। মন্টু রহস্যময় মিচকে হাসি দেয়। তারপর একবার আকাশ পানে তাকিয়ে নিয়ে বলে, এবার ফিরব বােলপুরে। সকাল থেকে ঘুরছি। টায়ার্ড। মেঘ করেছে। ঝড় জল আসতে পারে। আচ্ছা গুড বাই। 
দীপক গুম হয়ে রইল কিছুক্ষণ। মনে মনে ভাবল, মন্টু -টা ভালােই দিয়েছে। কয়েকটা ইন্টারভিউ করতে হবে, বেশ চমকপ্রদ। যাতে সমাচারকে টেক্কা দেওয়া যায়। ভাবতে ভাবতে একটা আইডিয়া তার মাথায় খেলে যায়। ছােটনকে বলল, আয় আমার সঙ্গে। ঝুমা বলল, কাকু খিদে পেয়েছে।
-এই মিনিট পনেরােয় একটা কাজ সেরে এসে খাওয়া যাবে। অগত্যা দীপকের পিছু নিল ছােটন ও ঝুমা।
মেলায় ঢোকার মুখে ভিখিরিদের সারির কাছে এসে দীপক বলল, আমি কয়েকজন ভিখিরির ইন্টারভিউ নেব। দাতাসাহেবের মেলা, ভিখিরিদের জন্য বিখ্যাত। এত ভিখিরি অন্য মেলায় আসে না। দেখি ওদের থেকে ইন্টারেস্টিং কিছু পাই কিনা?
শুনেই ঝুমা থমকে গিয়ে বলল, কাকু তুমি যাও, আমরা এখানে থাকি।
ছােটনের ভাব দেখে মালুম হল, তারও ওখানে যাওয়ার ইচ্ছে নেই। দীপক বলল, বেশ, তােরা এখানে অপেক্ষা কর।
দীপক প্রথমে এক বৃদ্ধা ভিক্ষুকের সামনে গেল। তাকে জিজ্ঞেস করল—কোথেকে আসছ?
-হুই গা হতে। বৃদ্ধা এক দিকে আঙুল দেখায়।
-ভিক্ষে করছ কেন? কেউ নেই তােমার?
-কেউ নেই বাবা, কেউ নেই। আপন লোক সব শত্তুর। বুড়িকে ঠকিয়ে সর্বস্ব নিয়ে এখন কেউ দু'মুঠো খেতে দেয় না—বৃদ্ধা কাঁদতে থাকে এবং কাপা কাপা দুর্বোধ্য কণ্ঠে নিজের দুঃখের কাহিনী বলে চলে।
দীপক তার কথা কিছুই উদ্ধার করতে পারে না। অপ্রস্তুত হয়ে বৃদ্ধাকে পঁচিশ পয়সা দিয়ে সে সরে যায়।
দীপকের নজর পড়ল কাছেই আর একজন ভিখিরির দিকে।
লােকটির শরীর বেশ জোয়ান। বয়স বেশি নয়। মাথাভরা রুক্ষ চুল। রং কালাে। সারা গাঁয়ে ধুলাে ময়লা। মুখে অযত্নে ছাঁটা পাতলা দাড়ি গোঁফ। পরনে ছেঁড়া ধুতি ও শার্ট। তার বাঁ পায়ে হাঁটুর নিচ থেকে গােছ অবধি নােংরা ন্যাকড়া পেঁচানাে ব্যান্ডেজের মতন। নিশ্চয় ঘায়ের ওপর ন্যাকড়া জড়িয়েছে। কারণ ব্যান্ডেজ তেলতেলে, তার ভেতর থেকে ফুটে উঠেছে লালচে ছােপ ছােপ। লােকটির পাশে শােয়ানাে একটা মােটা লাঠি। লােকটি কুঁজো হয়ে বসেছে। তার ডান পা মাটিতে ছড়ানাে, বাঁ পা হাঁটু মুড়ে সামনে তুলে রেখেছে। সে নিচু গলায় কাতর স্বরে মাঝে মাঝে ভিক্ষে চাইছে। করুণ চোখে দেখছে আগন্তুকদের। কখনাে বা মাথা নামিয়ে থাকছে। সামনে ভিক্ষাপাত্র, একখানি টিনের থালা।
দীপক ওই ভিখিরিটির কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করল, তােমার বাড়ি কোথায়?
ভিখিরিটি বােকার মতন দীপকের মুখ পানে তাকিয়ে থাকে। যেন প্রশ্নটা ধরতে পারেনি।
দীপক ফের জিজ্ঞেস করল। 
-সিউড়ির কাছে। ঘড়ঘড়ে চাপা গলায় জানায় লােকটি। 
-পায়ে কী হয়েছে?
লােকটি নিজের ন্যাকড়া জড়ানাে পা-টা দেখে। জবাব দেয় না। 
-কী হয়েছে ঘা? জিজ্ঞেস করে দীপক। 
লােকটি বলে, হু বাবু
-কী করতে আগে?
-আজ্ঞে মজুর খাটতাম। 
-ডাক্তার দেখিয়েছিলে? 
-হুম।
-ওষুধ খেয়েছিলে?
লােকটি চুপ করে থাকে।
দীপক বােঝে ঠিক মতাে ডাক্তার দেখানাে বা ওষুধ খাওয়া সম্ভব হয়নি ওর। সে জিজ্ঞেস করল, বাড়িতে কে কে আছে?
-আছে। এর বেশি উত্তর মেলে না। লােকটি ঘাড় নিচু করে থাকে। যেন নিজের পরিচয় দিতে তার বড়ই সংকোচ। হয়তাে এই বীভৎস ঘা হওয়ার কারণে নিজের স্বজনরা তার সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করেছে। এই ঘায়ের জন্য কাজও জোটে না। ফলে এখন ওর ভিক্ষাবৃত্তি মাত্র সম্বল। তাই বুঝি আগের সুস্থ জীবনের প্রসঙ্গ এড়াতে চায়। লজ্জা পায়। কষ্ট পায়।
দীপক জিজ্ঞেস করল, ডাক্তারের প্রেসক্রিপশন মানে, যে রােগ লিখে দিয়েছিলেন কাগজে সেটা কি আছে? দেখাতে পারবে?
লােকটি হতাশ ভাবে মাথা নাড়ে। দীপক বলল, তােমার যদি চিকিৎসার ব্যবস্থা করাই, করবে? লোকটি ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে থাকে। দীপক বুঝল তার কথা ওর বিশ্বাস হচ্ছে না।
দীপক ভাবে, সিউড়ির ডাক্তার মুখার্জি সুচিকিৎসক এবং উদার হৃদয়। তিনি দীপককে খুব স্নেহ করেন। দীপক অনুরােধ করলে হয়তাে এই লােকটিকে বিনা পয়সায় চিকিৎসা করতে রাজি হবেন। যদি এর কুষ্ঠ হয়, কোনাে কুষ্ঠ আশ্রমে পাঠাবার ব্যবস্থাও করতে পারেন ডাঃ মুখার্জি। হয়তাে একে সারিয়ে সুস্থ করে তুলতে পারা যাবে ঠিক মতাে চিকিৎসা হলে। দরকারে দীপকও চাঁদা তুলে সাহায্য করবে সাধ্য মতাে।
তবে এখনই একে বেশি আশা দিতে ভরসা হল না দীপকের। সে লােকটিকে বলল, তুমি এখানে আছ তাে? আমি আসছি, খানিক বাদে, কথা আছে। দেখি কী ব্যবস্থা করতে পারি। ভিখিরিটি ভাবলেশহীন মুখে চেয়ে থাকে।
ভিখিরিদের সাক্ষাৎকার নেওয়ার আর ইচ্ছে হল না দীপকের। সমাজের এই অসহায় অসুস্থ মানুষগুলির ইতিবৃত্ত খুঁজলে মন দুঃখে ভরে ওঠে।
মেলায় ঝুমা আর ছােটনকে নিয়ে একটা খাবারের দোকানে ঢুকল দীপক। পেল্লায় সাইজের লেংচার সঙ্গে গরম সিঙাড়া খেল।
ছোটন বলল, আমরা ইলেকট্রিক নাগরদোলায় চড়ব।
মেলার এক ধারে, ইলেকট্রিক নাগরদোলা বসেছে। দীপক বলল, বেশ তােমরা যাও নাগরদোলা চড়তে। আমি যতক্ষণ না যাই, ওখান থেকে আর কোথাও যেও না।
-বেশি তাড়াতাড়ি কিন্তু যেও না কাকু, ঝুমা বলে। অর্থাৎ তারা বেশ খানিকক্ষণ নাগরদোলা চাপতে চায়।
ছােটন ঝুমা চলে গেল। দীপক এক কাপ চায়ের অর্ডার দিয়ে সিউড়ির ডাঃ মুখার্জিকে একটা চিঠি লিখতে লাগল দোকানে বসে। ডাক্তারবাবুকে অনুরােধ জানাল, এই হতভাগ্য ভিখিরিটির চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে, যথাসম্ভব কম খরচে। এই চিঠিটা সে দেবে ওই অসুস্থ ভিখিরিটির হাতে। ঠিকানা দিয়ে বলবে, ডাক্তারবাবুর সঙ্গে দেখা করতে তার চিকিৎসার জন্য। আর সে বােলপুরে ফিরেই একটা চিঠি লিখবে ডাঃ মুখার্জিকে।
মিনিট পয়তাল্লিশ বাদে দীপক নাগরদোলার কাছে গিয়ে দেখে যে তখনও দুই মুর্তিমান নাগরদোলায় ঘুরছে। ইলেকট্রিক নাগরদোলার বিশাল চাকা। দীপক হাতছানি দিয়ে বিস্তর ডাকাডাকির পর ঝুমাদের ফের মাটিতে নামাতে পারল।
ঝুমা কাছে এসেই বলল, জানাে কাকু, সেই যে ভিখিরিটা, যার পায়ে ভীষণ ঘা, যাকে তুমি জিজ্ঞেস করছিলে, তাকে দেখলাম। লাঠিতে ভর করে খুড়িয়ে খুড়িয়ে হেঁটে গিয়ে দূরে একটা ছােট্ট তাঁবুতে ঢুকল। দাদা প্রথমে দেখেনি আমিই প্রথম দেখেছি।
দীপক একটু অবাক হয়ে বলল, তাই নাকি! কী করে দেখলি? ঝুমা বলল, কেন ওপর থেকে। নাগরদোলায় উচুতে বসে গােটা মেলা দেখা যায়। ব্যালান্স ঠিক হচ্ছিল না বলে আমরা অনেকক্ষণ উঁচুতে বসে ছিলাম। দীপক বলল, ও বােধহয় ওই তাবুতে থাকে রাতে। কিন্তু ও চলে গেল কেন? বললাম ওখানে থাকতে। ওকে বেরুতে দেখলি?
ছােটন বলল, না তা দেখিনি। তবে নাগরদোলা ঘােরার সময় তাে আর ওই তাবুটা সবসময় দেখতে পাচ্ছিলাম না। জানাে কাকু, খানিকবাদে আর একটা লােককে দেখেছি, ওই তাবুতে গিয়ে ঢুকল। লােকটাকে দেখে মনে হল একজন চানাচুরওলা।
-আঃ আরও একজন! চানাচুরওলা! ওই ভিখিরির সঙ্গে এক তাবুতে! দীপক রীতিমতাে অবাক। বলল, চল তো দেখি লােকটা ফিরেছে কি না?
ভিখিরিদের সারিতে গিয়ে দীপক দেখল, সেই পায়ে ঘা লােকটি নেই। ও কি তবে এখনও তাবুতে? সে ছােটনদের বলল, চল, সেই তাবুটা দেখা।
মেলার একদিকের সীমানায় গিয়ে ছােটন দেখাল, ওই তাবু।
মেলার সেদিকে দােকানপাটের সীমানার শেষে কিছু বলদ ও মােষের গাড়ি এবং অল্প কটা তাবু কাছাকাছি। এদের থেকে বেশ খানিক দূরে দূরে একটা গাছের নিচে ছােট্ট একটা তাবু। সরু গাছটার গুঁড়ির মাঝে খুঁটি বানিয়ে ছেড়া চট টানােনা হয়েছে তাবুর আকারে। মিনিট দশেক মেলার সীমানায় দাঁড়িয়ে তাবুটা লক্ষ্য করল দীপক। তার মনে একটা সন্দেহ জাগে। কিন্তু ছােটনদের কাছে তা প্রকাশ করল না। সে বলল, ছােটন ঝুমা তােরা একটা কাজ কর। এখানে বসে খানিকক্ষণ ওয়াচ কর তাবুটাকে। ওই খড় পড়ে আছে। দু আটি এনে বস। আমি এই ফাঁকে মেলায় গিয়ে কিছু কাজ সেরে আসি। নজর রাখবি সেই ভিখিরিটা বেরােয় কিনা? বেরুলে কোন দিকে যায়। আর কেউ ঢুকলে বা বেরুলেও নজর রাখবি।
ঝুমা ব্যাজার হয়ে বলল, কতক্ষণ থাকতে হবে?
-বেশিক্ষণ নয়।
-মােগলাই পরােটা খাওয়াতে হবে কিন্তু, বলল ছােটন।
-পুতুল নাচ দেখাতে হবে আর একবার নাগরদোলা চাপব। ঝুমা যােগ দেয়।
-বেশ বেশ হবে সব, ঘুরে আসি। দীপক চলে যায়।
মেলায় গিয়ে দীপক চটপট দু'জনের সাক্ষাৎকার নিল। প্রথমে এক বৃদ্ধ মুসলমান আগন্তুকের। দুর্গাপুরে থাকেন। প্রতিবারই এই মেলায় আসেন। তিনি একটা নতুন কথা শােনালেন যে এই মেলায় নাকি মাছি আর কুকুর একদম দেখা যায় না। দীপক ভেবে নিল কথাটা যাচাই করব পরে।
এরপর সে এক পাথরের থালা বাটি ইত্যাদি দােকানদারের ইন্টারভিউ নিল। এরপর দীপক গেল দাতাসাহেবের মাজারের কাছে। কালাে আলখাল্লা ও টুপি পরা প্রচুর ফকির সেখানে ভিড় করেছে। দীপক তাদের হাবভাব লক্ষ্য করল। কান পেতে শুনে নােট করে নিল তাদের কিছু কথাবার্তা, আলাপ, পরিচয়। আধঘণ্টা বাদে সে ফের ছােটনদের কাছে হাজির হল। 

ছােটনরা উৎসুকভাবে তাকিয়েছিল তাবুটার দিকে। কাকাকে দেখেই সমস্বরে বলে উঠল, জানাে সেই চানাচুরওয়ালা আর অন্য একটা লােক ওই তাবু থেকে বেরিয়ে মেলায় গিয়ে ঢুকল। দুজন কথা বলতে বলতে যাচ্ছিল।
-অন্য লােকটা দেখতে কেমন? দীপকের প্রশ্ন।
ঝুমা বলল, লােকটা গুন্ডা মতন। ধুতি শার্ট পরা। রং ময়লা। মুখ ভালাে করে দেখতে পাইনি এত দূর থেকে, তবে মোটা গোঁফ আছে।
-হাইট। জানতে চায় দীপক। 
-এই মাঝারি।
-দাঁড়ি আছে?
-না।
ভাই-বােন ঘাড় নাড়ে। দীপক ভাবে একটুক্ষণ। তারপর সে সােজা চলে যায় তাবুটার দিকে। চটের পর্দা সরিয়ে তাবুর ভিতরে উঁকি মারে। তাঁবু ফাঁকা, কেউ নেই। সে ফিরে আসে ছােটনদের কাছে। 
দীপকের মনে যে সন্দেহটা জাগছিল সেটা দৃঢ় হয়। সে শুনেছে যে অনেকে কানা খোড়া ঘেয়াে রুগির ছদ্মবেশ ধরে ভিখিরি সেজে ভিক্ষে করে। না খেটে এ এক দিব্যি রােজগারের পন্থা। এটাও তেমনি কেস নাকি? পায়ে ঘা সেই লােকটি ভিখিরিদের জায়গায় ফেরেনি। এখানে আসার সময় সে দেখে এসেছে। রহস্যটা অনুসন্ধান করে যদি সত্যি প্রমাণ পায়। তাহলে দারুণ একখানা খবর ছাড়া যাবে বঙ্গবার্তায়।
ছােটন আর ঝুমাকে নিয়ে দীপক প্রথমে পুতুল নাচ এবং চিড়িয়াখানা দেখল। এরপর ছােটন ঝুমা দুপাক নাগরদোলা খেল। দীপক নাগরদোলায় উঠল না অবশ্য। ওই ফাঁকে এক কাপ চা খেয়ে নিল।
একটা দোকানে মােগলাই পরােটা ভাজা হচ্ছে দেখে দীপক ছোটনকে একখানা দশ টাকার নােট দিয়ে বলল, তােরা খা। আমি একবার বাসের টাইমটা খোঁজ করে আসি। বােলপুরের বাস কখন কখন আছে? আরও দু'একটা খোঁজ নিতে হবে। খাওয়া হলে, এই দোকানেই অপেক্ষা করিস আমার জন্যে।
যদিও ঘড়ির সময় মাফিক বিকেল শেষে সন্ধ্যা নামতে তখনাে খানিক বাকি কিন্তু আকাশে মেঘ করেছে। দিনের আলাে প্রায় নিভু নিভু। আর দেরি করা উচিত নয়। | দীপক বাসস্ট্যান্ডে মােটেই গেল না। সে প্রথমে ভিখিরিদের জমায়েতে গিয়ে একবার চোখ বুলাল। সে পায়ে ঘা লােকটির পাত্তা নেই। এরপর সে চলল মাঠের মাঝে সেই রহস্যময় তাবুর উদ্দেশ্যে।
পর্দা ফাঁক করে তাঁবুর মধ্যে উঁকি দিল দীপক। ভিতরে একটা মােমবাতি জ্বলছে এবং একজন লােক মাটিতে বসে। লােকটির সামনে বিছানো একখণ্ড কাপড়ের ওপর একরাশ খুচরাে পয়সা। বােধহয় পয়সা গুনছে লােকটি।
লােকটি চমকে মুখ তুলে দীপককে দেখেই খুচরাে কাপড়টা নিজের পকেটে পুরে ফেলে কর্কশ স্বরে বলল, কে?
লােকটাকে এক নজর দেখেই দীপক বুঝে নিয়েছিল, এ সেই লােক। যাকে চানাচুরওয়ালার সঙ্গে তাবু থেকে বেরিয়ে যেতে দেখেছিল ঝুমারা। এদের বর্ণনার সঙ্গে এই লােকটার চেহারা ভীষণ মিলে যাচ্ছে। দীপক পা বাড়িয়ে হেসে বলল, নমস্কার। আমি একজন সাংবাদিক। এই মেলার বিষয়ে খবর নিতে এসেছি। ঘুরতে ঘুরতে এই তাবুটা দেখে ভাবলাম, কোনাে যাত্রী নিশ্চয়। আপনার একটা ইন্টারভিউ নিতে চাই।
-কে আপনি? লােকটি কেমন সন্দিগ্ধ।
-বললাম যে রিপাের্টার। মানে সাংবাদিক। মানে কাগজের লােক। খবর জোগাড় করি। 
-কী চাই? 
-কিছু প্রশ্ন করব যদি উত্তর দেন। মশায়ের নাম? 
উত্তর হয়, রাধাচরণ মণ্ডল।
-কোত্থেকে আসছেন? 
-সাইকিয়া। 
-প্রত্যেকবার আসেন এই মেলায়? 
-না, মাঝে মাঝে।
-কী জন্য এসেছেন? 
-এমনি বেড়াতে।
দু'চারটে এমনি আলতু-ফালতু প্রশ্ন করতে করতে দীপক লক্ষ্য করল যে, যদিও এই লােকটির দাঁড়ি কামানাে, মােটা গোঁফ, তেল চকচকে চুল পাটি করে আঁচড়ানাে তবুও এর নাক চোয়াল চোখ ইত্যাদি এবং শরীরের গঠনের সঙ্গে সেই পায়ে ঘা ভিখিরিটির মিল খুঁজে পাওয়া যায়।
রাধাচরণও যেন কিঞ্চিৎ নার্ভাস। দায়সারা গােছের জবাব দিচ্ছে। দীপক ফস করে বলে বসল, দুপুরের দিকে একজন ভিখিরি কি এসেছিল আপনার কাছে। তার বাঁ পায়ে ঘা।
রাধাচরণ কেমন আড়ষ্ট হয়ে গেল। তারপর রাগী চাপা সুরে বলল, আপনি জানলেন কেমন করে?
-এই দিক দিয়ে যাচ্ছিলাম তখন দেখলাম দূর থেকে। এই তাবুতে ঢুকল ভিখিরিটি। চেনেন নাকি ওকে?
-হুম। আমার মামার বাড়ির গায়ের লােক। ঘা হয়ে এখন ভিক্ষে করে। লােকে বলে কুষ্ঠ।
-কী করতে এসেছিল? 
-কিছু সাহায্য চাইতে। দিলাম। গরিব মানুষ অক্ষম হয়ে গেছে। খেতেও দিলাম কিছু। 
দীপক কিঞ্চিৎ দ্বিধায় পড়ে। রাধাচরণের বক্তব্য একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। হয়তাে বা ঠিক। এখানে কিছু সাহায্য নিতেই এসেছিল ভিখিরিটি। নাগরদোলায় পাক খাবার ফাঁকে তার চলে যাওয়া দেখতে পায়নি ঝুমারা। তবু রাধাচরণের উসখুস ভাব দেখে সন্দেহ ঘােচে না। তা ছাড়া দু'জনের চেহারায় এত সাদৃশ্যই বা কেন?
সহসা দীপকের চোখ আটকে যায় তাবুর এক কোণে। সেখানে মাটিতে কিছু ময়লা ছেড়া ন্যাকড়া ও কাপড়ের পাড় পড়ে আছে। এমনি ন্যাকড়া ও পাড় দিয়েই তাে ভিখিরিটির পা জড়ানাে ছিল। সঙ্গে সঙ্গে দীপকের দৃষ্টি চলে যায় রাধাচরণের বাঁ পায়ের দিকে। হাঁটুর নিচে যেটুকু পা বেরিয়ে আছে তা মােটামুটি পরিষ্কার হলেও তাতে যেন অস্পষ্ট কালচে ছােপ জায়গায় জায়গায়। এই সময় রাধাচরণ চট করে তার বাঁ পা ধুতি টেনে ঢেকে দিল।
রাধাচরণের সঙ্গে খেজুরে আলাপ চালাতে চালাতে এবং নােট বইয়ে ইন্টারভিউ লেখার ভান করার ফাঁকে দীপক দ্রুত চিন্তা করে আসল কথাটা কী ভাবে বলা যায়? সােজাসুজি চার্জ করব কি? কী ভাই তুমিই না ভিখিরি সেজে বসেছিলে? পায়ে নকল ঘা বানিয়ে। হুঁ ঠিক চিনেছি।
লােকটা কি চটে গিয়ে তেড়ে উঠবে? মারতে আসবে? তাতে অবশ্য ভয় পায় না দীপক। ওর আক্রমণের মােকাবিলার শক্তি সে রাখে। তবে তেড়েফুড়ে ওঠার চেয়ে ওর ঘাবড়ে যাওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। তখন চাপ দিয়ে আসল ব্যাপার টেনে বের করা যাবে। বরং আশ্বাস দেব, যদি আপত্তি থাকে কাগজে ছাপব না তােমার কথা। শুধু এই নকল ভিখিরিদের ব্যাপারটা জানতে চাই। এদের কায়দাকানুন। রােজগার। স্রেফ আমার ব্যক্তিগত কৌতূহল।
অবশ্য এমন ইন্টারেস্টিং স্টোরি পেলে কি আর না ছাপা যায়। শুনে নিয়ে এখান থেকে চলে যাওয়ার পর কে আর পায় তাকে। আর এ লােকটাও কি আর ওর সত্যি পরিচয় দেবে? কখনো নয়। এখানে সেজেছে রুগি। অন্য কোথাও হয়তাে বনে যাবে বােবা কালা। ছদ্মবেশও পাল্টাবে। লােক ঠকানাের অপরাধে পুলিশ ওর হদিশই পাবে না। তবে হ্যাঁ, যদি ওর কথা শােনায়, দীপক এখানে ওর নামে পুলিশে নালিশ করবে না। সেটুকু কৃতজ্ঞতা বােধ তার আছে।
মৃদু খসখস আওয়াজ আসে কানে। লেখা থেকে মাথা তুলে দীপক দেখল, রাধাচরণ কেমন বাঁকা চোখে তাকিয়ে আছে। তার নজর দীপকের ঘাড়ের ওপর দিয়ে নিবন্ধ। দীপক পিছু ফেরার আগেই সে মাথার পেছনে এক প্রচণ্ড আঘাত পেল এবং সঙ্গে সঙ্গে জ্ঞান হারাল।
দীপক যখন চেতনা ফিরে পেল তখন তাঁবুর ভিতর অন্ধকার। বাইরে তখনও পুরােপুরি রাত নামেনি। তাবুর কাপড়ের ফাঁক দিয়ে আবছা দিনের আলাে চোখে পড়ল।
দীপক পাশ ফিরে সটান হয়ে পড়ে আছে মাটিতে। তার পা দুটো বাঁধা। দুই হাত পিছমােড়া করে বাঁধা। মুখও বাধা। | মুখের ভিতর কাপড় ঠুসে দেওয়া হয়েছে। তাঁবুতে আর কেউ নেই।
নড়াচড়া করতে গিয়ে দীপক টের পেল যে তাবুর মাঝে গাছের গুড়ির সঙ্গে তার কোমরের কাছে দড়ি দিয়ে শক্ত করে বাধা রয়েছে। অর্থাৎ বেশি নড়াচড়া করা বা চেচানাের উপায় নেই। অতি অসহায় অবস্থা।
দীপক প্রাণপণে চেষ্টা করে বাধনমুক্ত হতে। কিন্তু তার ছটফটানিই সার হয়। দড়ির গিট আলগা করতে পারে না। গলা দিয়ে চাপা গোঁ গোঁ আওয়াজ বের করতে পারে শুধু। কিন্তু এই নিরালায় সে আওয়াজ কি কারও কানে পৌঁছবে? কেউ কি এগিয়ে আসবে তাকে উদ্ধার করতে। এভাবে কতক্ষণ কাটবে কে জানে? বাইরের আলাে ক্রমে আরও ম্লান হয়ে আসে।
খানিকক্ষণ এইভাবে কাটে। হঠাৎ তাবুর পর্দা সরিয়ে একটা মুখ উঁকি দিল ভিতরে। আবছায়ায় দেখে দীপকের মনে হল ও মুখ ছোটনের। সে আপ্রাণ চেষ্টায় ডাকতে চেষ্টা করে। কিন্তু একটা গােঙানির মতাে আওয়াজ মাত্র বের হয়। চট করে মাথা টেনে নেয় ছােটন, বােধহয় ভয় পেয়ে।

দীপক মাটিতে মুখ ঘষে মুখের বাঁধন আলগা করে ফেলল। ছিঁড়ে গেল তার গাল, ঠোঁট থুতনি। কিন্তু তখন সে মরিয়া। কোনােরকমে মুখের ভিতরে গোঁজা ন্যাকড়ার পিণ্ড খানিকটা উগরে ফেলে সে বিকৃত কণ্ঠে ডাক দিল, ছােটন। এরপরই কাশতে কাশতে যেন তার দম আটকে আসে। ছোটন দৌড়ে ঢুকল তাবুতে। দীপকের গলা সে ঠিক চিনেছে। ডাকল—কাকু। দীপক কাশি সামলে বলল, খুলে দে। হাত পা বাঁধা। ছােটন অন্ধকারে হাতড়ায় বাঁধন খুলতে। আমার প্যান্টের পকেটে দেশলাই আছে। জানায় দীপক। দেশলাইয়ের আলােয় কাজটা অনেক সহজ হয়ে গেল।
বাঁধনমুক্ত হয়ে বসে হাঁপায় দীপক। হাত পা মুখে আঙুল বােলায় বাঁধনের জায়গাগুলােয়। ছাল উঠে গিয়ে মুখ ভীষণ জ্বলছে।
-একি তােমায় এরকম করল কে? আতঙ্কে উত্তেজনায় ছােটন হতভম্ব। দীপক সংক্ষেপে জানায় তার এই দুরবস্থার কাহিনী। বলে, পেছন থেকে যে কে মারল দেখতে পাইনি। তবে তাবুর লােকটাই নকল ভিখিরি সন্দেহ নেই। ইস শয়তানটার আর বােধহয় পাত্তা পাওয়া যাবে না। কিন্তু তুই এখানে এলি কী করে? ঝুমা কই ? দীপকের কথার জবাব না দিয়ে ছােটন উত্তেজিতভাবে বলে ওঠে—জানাে সেই চানাচুরওয়ালাটাকে দেখলাম বাস স্ট্যান্ডে, একটু আগে। ওর সঙ্গে একটা লােক ছিল। তবে আগের লােকটা নয়, অন্য লােক। দাঁড়ি আছে, ছুঁচলাে মতাে। লুঙ্গি জামা পরা। মাথায় মুসলমানি টুপি, সাদা রঙের। দু'জনে চা খাচ্ছিল।
-অ্যা বাস স্ট্যান্ডে। দীপক তড়াক করে উঠে দাঁড়িয়ে ছােটনকে টানে—চল চল শিগগির।
বাস স্ট্যান্ডের দিকে যেতে যেতে অল্প কথায় দীপক জেনে নেয় কী ভাবে ছােটন হাজির হল এই তাবুতে। 
বেশ খানিকক্ষণ দীপকের আশায় ওই খাবার দোকানে অপেক্ষা করেও দীপক আসছে না দেখে, ছােটন ঝুমাকে দোকানে বসিয়ে রেখে যায় বাস স্ট্যান্ডে। কারণ কাকু বলেছিল যে বােলপুরের বাসের টাইম খোঁজ নেবে। সেখানে দীপককে না পেয়ে ছােটনের মনে হয় মাঠের মধ্যে তাবুটা একবার দেখে আসি।
-ঝুমাকে একা রেখে এলি কেন? বলল দীপক।
ছােটন বলল, বাঃ তুমি যদি এসে ঘুরে যাও, আমাদের কাউকে দেখতে না পেয়ে কি ভাবতে।
বাস স্ট্যান্ডে জোরালাে বৈদ্যুতিক বাতি নেই। সন্ধ্যা নেমেছে। আধাে অন্ধকার মাঠে খাড়া অনেকগুলাে বাস। যাত্রীও অনেক। বেশির ভাগ যাত্রীই ঘরে ফেরার অপেক্ষায়। যাত্রীরা কোথাও জটলা করছে, কেউ কেউ ইতস্তত ঘোরাঘুরি করছে। কোনাে বাস একদম ফাকা। কোনাে কোনাে বাসের মাথায় ও কামরার ভিতরে আলাে জ্বলছে। কিছু যাত্রী উঠে বসেছে সেসব বাসে। কন্ডাকটাররা হাঁকাহাঁকি করে আহ্বান জানাচ্ছে প্যাসেঞ্জারদের।

যাত্রীদের টর্চের আলাে, বাসের আলাে এবং দু-তিনটে চায়ের দোকানের ল্যাম্পের আলােয় যতটুকু দেখা যায়।
দীপক ছােটনকে বলল, লক্ষ্য রাখ, সেই চানাচুরওয়ালা বা তার সঙ্গীর দেখা পাস কিনা?
দীপকের নিজের চোখও খোঁজে তাবুর সেই গুফো লােকটাকে। দ্রুত পায়ে ঘােরে তারা। জনে জনের মুখে দৃষ্টি বােলায়। চায়ের দোকানে সেই লােক দুটো তখন আর নেই। দীপকের আশঙ্কা ইতিমধ্যে ওরা হয় তাে বাসে চড়ে সরে পড়েছে। যতটা সম্ভব আড়ালে থাকে দীপক, উজ্জ্বল আলাে এড়িয়ে। যাতে তাকে না দেখে ফেলে তারা। মুশকিল এই যে ওই চানাচুরওয়ালাকে সে দেখেনি, তাই ছােটনই প্রধান ভরসা।
হঠাৎ ছােটন আঙুল দেখায়—ওই যে।
একটা বাসের ভিতরকার বাল্ব জ্বলছে। সিট অর্ধেক ভরে গেছে যাত্রীতে। কন্ডাকটার চিৎকার করছে, সিউড়ি, চলে আসুন সিউড়ি।
বাসটার দরজার উল্টো দিকের মাঝামাঝি জায়গায় একখানা দুজনার সিটে বসা দুই প্যাসেঞ্জারকে দেখিয়ে ছােটন বলল, জানলার ধারে যে ওই সেই চানাচুরওয়ালা। আর পাশে বসে দাঁড়িওয়ালা লােকটা।
তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে লােক দুটোকে দেখতে দেখতে দীপক বলে, ঠিক চিনেছিস?
জানলার ধারে বসা লােকটা মুখে হাত চাপা দিয়ে ঘাড় গুজে রয়েছে। তার মুখ ভালাে দেখা যাচ্ছে না। শুধু বােঝা যাচ্ছে তার মাথায় ঝাঁকড়া চুল।
-হ্যা। দৃঢ়স্বরে জানায় ছােটন, একবার মাথা তুলেছিল, তখন দেখলাম।
দীপক ছােটন বাস থেকে খানিক দূরে। অন্য একটা বাসের ছায়ায়। তাই ওই বাস থেকে তাদের দেখার সম্ভাবনা নেই!
দীপক সিউড়িগামী বাসের পিছনের দরজার কাছে গিয়ে কন্ডাকটারকে বলল, দাদা বাস কখন ছাড়বে?
জবাব হয়—এক্ষুনি। 
দীপক দেখে নিল, ড্রাইভার তখনও সিটে বসেনি। সে কন্ডাকটারকে অনুরােধ করল, আমরাও সিউড়ি যাব। এই ছেলেটা রইল, আমার ভাইপাে। একজন মেয়ে আছে সঙ্গে, দোকানে বসিয়ে এসেছি। তাকে নিয়ে আসছি। প্লিজ একটু অপেক্ষা করবেন।
-যান যান তাড়াতাড়ি, কন্ডাকটার তাড়া লাগায়।
-আমি আসছি। তুই লােক দুটোর ওপর নজর রাখ। ছােটনের কানে ফিসফিসিয়ে বলেই দীপক হনহন করে হাটা দিল মেলার দিকে। কন্ডাকটার ছােটনকে বলল, সিটে বসে জায়গা রাখ।
ছোটন পিছনের সিটে একখানা রুমাল পেতে রেখে ফের নেমে এল। 
দীপক ফিরল মিনিট পনেরাে বাদে। তার সঙ্গে ঝুমা এবং দুজন কনস্টেবলসহ এক পুলিশ অফিসার।
বাসে তখন ড্রাইভার সিটে বসেছে। ঘন ঘন হর্ন বাজছে। সিটগুলাে ভর্তি, দু-তিনজন প্যাসেঞ্জার দাঁড়িয়েও রয়েছে। কন্ডাকটার গজগজ করছে ছোটনের কাছে, কই তােমার কাকা তাে এখনও এল না। এবার বাস ছেড়ে দেব। আর লেট করতে পারব না।
আচমকা পুলিশ সমেত দীপকের আবির্ভাবে কন্ডাকটারের কথা থমকে গেল। ঝুমাকে ছােটনকে নিচে রেখে দীপক পুলিশদের নিয়ে পিছনের দরজা দিয়ে উঠল বাসে এবং সেই চানাচুরওলা ও তার সঙ্গীকে দেখিয়ে পুলিশ অফিসারকে বলল—এই দু'জন।
বাসের যাত্রীরা থ। তাদের গুঞ্জন মুহূর্তে স্তব্ধ। চমকে ঘাড় ফেরাল ঝাকড়াচুলাে চানাচুরওলা এবং তার ছুঁচালাে দাঁড়ি সঙ্গী। তারা ধড়মড় করে উঠে পড়তে গেল। কিন্তু তারা সিট ছেড়ে বেরুবার আগেই পুলিশ ইন্সপেক্টর তাদের পথ আগলে সিটের পাশে পৌঁছে গেছেন। হাতে তার উদ্যত রিভলভার। প্রচণ্ড ধমক লাগালেন ইন্সপেক্টর। নড়লেই গুলি করব।
তৎক্ষণাৎ দুই যাত্রী ফের বসে পড়ে কাঠ হয়ে থাকে। লােক দুটোকে দৃঢ় চোখে দেখে নিয়ে ইন্সপেক্টর মাথা ঝাকালেন। তারপর দাড়িওলা লােকটিকে জিজ্ঞেস করলেন, কী নাম?
-নবাব আলি। লােকটি ঢােক গিলে জবাব দেয়।
-একে চেনাে? ওর পাশের যাত্রীকে দেখান ইন্সপেক্টর।
-না। নবাব আলি ঘাড় নাড়ে। 'ইন্সপেক্টর স্থির দৃষ্টিতে তাকে দেখতে দেখতে হঠাৎ তার দাঁড়ি ধরে মারলেন এক হেচকা টান। চড়াৎ করে খুলে এল নকল দাড়ি। ইন্সপেক্টরের হাতের এক ঝটকায় উড়ে গেল লােকটার মাথার টুপি। দীপক চিনল, এই সেই পায়ে ব্যান্ডেজ বাঁধা ভিখিরি।
-বেটাদের বেঁধে নামা। সাবধান, পালায় না যেন। ইন্সপেক্টর হুকুম দিলেন কনস্টেবলকে। অতঃপর তিনি ব্যঙ্গ কৌতুক মিশিয়ে চিবিয়ে চিবিয়ে মন্তব্য ছাড়লেন, আহা নবাব বাদশাদের কি আর এমন ভিড়ের বাসে যাওয়া পােষায়। চল বাবা, তোদের আলাদা গাড়িতে সিউড়ি পাঠাবার ব্যবস্থা করছি।
হাত পিছমােড়া করে বেঁধে এবং কোমরে দড়ি এঁটে লােক দুটোকে নামানাে হল বাস থেকে।
বাসের বাইরে এসে পুলিশ ইন্সপেক্টর দীপককে বললেন—থ্যাংক্যু মিঃ রয়। দুটোই ডেঞ্জারাস ক্রিমিনাল। ফেরারি ডাকাত। পুলিশ খুঁজছিল এদের।
আসামিদের নিয়ে চলে যায় পুলিশরা।
ছােটন ও ঝুমাকে নিয়ে দীপক চলল বােলপুরের বাসের খোঁজে। জব্বর খবর দীপকের পকেটে।

No comments

Theme images by Jason Morrow. Powered by Blogger.