সোম থেকে শুক্র - এষা দে Shom Theke Shukro by Esha Dey
-ছেলের বিয়ে দিচ্ছিস যে আলাদা ফ্ল্যাট করেছে ছেলে?
- না?
- একসঙ্গে থাকবি! শখ আছে বটে তোর। আমি বাবা দুই মেয়েকেই বাইরে পাচার করে দিয়েছি, একজন ব্যাঙ্গালোরে, অন্যজন নিউইয়র্কে। কী শান্তিতে যে আছি। লেখিকা বান্ধবী শুচিস্মিতা দত্তর কথায় হাড়পিত্তি জ্বলে গিয়েছিল অলকার। সর্বদা পারিবারিক গল্প লিখে লিখে ধরেই নিয়েছে ছেলে-ছেলের বউ নিয়ে সংসার মানেই ধুন্ধুমার। নিমন্ত্রণপত্রটা বন্ধুর হাতে দিতে দিতে জোর করে মুখে হাসি টেনে বলেছিলেন, মেয়েরা তো পরের বাড়ি যাবে জানা কথা, চাকরি-বাকরিও সব এখন বাইরে। আমার একটাই ছেলে, তাও সৌভাগ্য কলকাতায় আছে। আমাদের দেশে ছেলে তো বাবা-মা'র সঙ্গেই থাকে, তাই না? তাছাড়া মরার সময় মুখে জলটুকু অন্তত পাব। দেখছিস তো, আমাদের ক্লাসের বাপ-মা তো সব বাসি মরা হয়ে পড়ে থাকে আজকাল। ছেলেমেয়ে আমেরিকা, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, নিদেনপক্ষে ব্যাঙ্গালোর। তিনিই বা ছেড়ে কথা কইবেন কেন।
-মরার কথা না ভেবে কেমন করে বাঁচবি সেটা ভাব। লেখিকা তো, শেষ চালটা ও-ই দিল।
-হ্যাঁ, এইভাবেই বাঁচা। কেটলিতে জল ভরে গ্যাস জ্বেলে বসান অলকা। প্রেশারের রুগি। রাতে ভালো ঘুম হয় না। নিত্য ঘুমের ওষুধ। সকাল-সকাল ওঠা কষ্ট, মাথাটা ভার ভার, শরীরে যেন জোর নেই। স্বামী দীপকের প্রায় কাকডাকা ভোরে ঘুম ভাঙে— সুগার আছে তো। হাত পায়ের ব্যায়াম সেরে দাড়িটাড়ি কামিয়ে রেডি হয়ে তিনি রান্নাঘরের বিনটা ফ্ল্যাটের দোড়গোড়ার বাইরে রেখে দেন। এজমালি জমাদার ভজুয়া তো ঘোড়ায় জিন দিয়ে আসে। পট পট করে ময়লার ব্যাগগুলো তুলে নিয়ে যায়। দরজার সামনে বিন না থাকলে দয়া করে বেল বাজিয়ে নেবার ধৈর্য নেই। এখন দীপক অ্যাকোয়া গার্ড চালিয়ে বোতল বোতল জল ভরছেন, সারাদিনের এবং রাতের। বউমা ও নিলু দু'বোতল নিয়ে কাজে বেরুবে। অলকা ফ্রিজ থেকে মোসাম্বি, আপেল বের করেন। দুধ মাখন ডিম দু'জনেরই বারণ। দীপকের আবার ইউরিক অ্যাসিডও হয়েছে। টোস্টারের প্লাগ লাগান। ভেজিটেবল স্যুপের প্যাকেট খুলে চামচে করে আন্দাজে দু'কাপের মতো নিয়ে স্যুপ বসান। ডেকচিতে জল দিয়ে ফ্রিজার থেকে মাছ এনে ডুবিয়ে রাখেন। তরি-তরকারির জায়গাটা টেনে তুলে এনে কী রান্না হবে ভাবতে ভাবতে খোঁজেন সেদ্ধর জন্যে উচ্ছে, স্যালাডের জন্যে টমেটো, শশা।
-ফের তুমি নিচু হলে! তোমার না বারণ। একেই দু'বার পেট কাটা, তার ওপর আথ্রাইটিস। দীপকের মৃদু শাসনে অপ্রতিভ অলকা উত্তর দেন, কাজ করার সময় অত খেয়াল থাকে না। শোভার মাকে তো জান। সাতটায় আসার কথা। সাড়ে সাতটার আগে তার টিকিটি দেখা যায় না। কী রান্না হবে বিয়েবাড়ির তত্ত্বের মতো সব তার হাতের কাছে সাজিয়ে দিতে হয়। ওরা খেতে বসবে ঠিক পৌনে ন'টায়। তার মধ্যে ভাত ডাল মাছ তরকারি অন্তত চাই। নইলে সারাদিন থাকবে কী করে। ফিরতে ফিরতে তো ওদের সাড়ে সাতটা-আটটা।
দরজায় বেল। অলকা গিয়ে খোলেন। গ্রিল গেটে গোঁজা খবরের কাগজ নিয়ে রাখেন খাবার টেবিলে। স্বামী-স্ত্রী ব্রেকফাস্টে বসেন। খবরের কাগজের দুটি পৃষ্ঠা দু'জনের সামনে মেলা। চোখ বোলাতে বোলাতে ফল টোস্ট স্যুপ খাওয়া। চায়ে চুমুক দিয়েছেন, এমন সময়ে দরজায় বেল দ্বিতীয়বার। দীপক উঠে খোলেন। শোভার মায়ের আগমন, সাড়ে সাতটা বাজে। যেন টের পেয়েই শোবার ঘর থেকে ঘন বেগুনি রঙের নাইটি পরিহিতা বধূমাতা অর্থাৎ রুনুর নির্গমন।
-ও মাসি, আমাদের চা-টা বসিয়েছ? কাজের লোকেদের 'মাসি' ডাকা অলকার ভারী অপছন্দ। ওঁদের যৌবনকালে নিম্নবর্গীয় বয়স্ক নারীকে 'মাসি' বলা চালু ছিল বিশেষ পাড়াতে। রান্নার লোক বামুনদি, পরে অমুকের তমুকের মা। তাই তো যথেষ্ট।
-এই যে বউদি, জল চড়াচ্ছি। দু'মিনিটে হয়ে যাবে, দাদার চা আর তোমার হল্লিকস।
-উফ্ ‘হল্লিকস' নয় হরলিকস। তাছাড়া ওটা তো কমপ্ল্যান। কতবার শিখিয়েছি।
-আমাদের কাছে সবই হল্লিকস।
-দেখেছ মা, এরা একটা কথাও ঠিকমতো বলতে পারে না। নিলয়ের চা ও নিজের কমপ্ল্যান, দুটি কাপ হাতে রুনুর শোবার ঘরে প্রত্যাবর্তন।
তৃতীয়বার দরজায় বেল। এবারে খোলার পালা অলকার। ঠিক যা ভেবেছেন, শ্রীমতী শেফালি, যার ঘরদোর ঝাড়-পোঁছ ইত্যাদি কাজ শুরু করার নির্ধারিত সময় সকাল ন'টা।
-বলেছি না এত তাড়াতাড়ি আসবি না। দেখ তো দাদা-বউদির ঘর বন্ধ। যা, আমাদের ঘর থেকে শুরু কর।
আবার খেতে বসেন অলকা। চা শেষ হতে না হতে টেলিফোন। ক্রিং ক্রিং। বাজছে, বাজছে।
-ধরো না।
-তুমি ধরো না।
-আমাদের এত সকালে ফোন করার কেউ নেই, নিশ্চয় ওদের।
-ওদের তো মোবাইল আছে।
-বোধ হয় চার্জে বসিয়েছে, অলকা উঠতে উঠতে বলেন।
-হ্যালো, কে, মাসিমা? আমি সুনন্দা, রুনুর মাসতুতো দিদি বলছি। কেমন আছেন? মেসোমশাই ভালো আছেন তো? আপনারা কই একবারও এলেন না আমাদের বাড়িতে এই তিন বছরে। আসবেন কিন্তু একদিন। আচ্ছা, রুনুকে একটু ডেকে দেবেন? ওর মোবাইলটা অফ করা।
-হ্যাঁ, ধরো দিচ্ছি। হ্যান্ড সেটটা হাতে ছেলের ঘরের বন্ধ দরজার সামনে দাঁড়িয়ে ডাকেন, রুনু, ফোন। এক গাল কামানো নিলয় দরজা ফাঁক করে মুখ বাড়িয়ে বলে, স্নানে গেছে, মেসেজ নিয়ে নাও।
-সুনন্দা, রুনু তো স্নানে ঢুকেছে। যদি কিছু বলার থাকে আমি বলে দেব?
-মাসিমা, ওকে কাইন্ডলি বলে দেবেন মিসেস ব্যাটরা ওর আর আমার জিনিসগুলো ময়নাদির বাড়িতে ডেলিভারি দিয়ে গেছে। হ্যাঁ, ময়নাদি মানে বড়মামার মেয়ে ওই যে সন্তোষপুরে থাকে। রুনু যেন সন্ধে ছটার সময় ট্রেডার্সের সামনে দাঁড়ায়। গড়িয়াহাটের মোড়ে ও জানে, আমরা তো ওখানেই মিট করি। একসঙ্গে যাব'খন আনতে। টাকা যেন আবার ভুলে না যায়।
-বলে দেব, ট্রেডার্সের সামনে, ছটা, টাকা নিয়ে, এই তো?
-হ্যাঁ। এমন মেসেজ প্রায়ই নেন অলকা। প্রথম দিকে একবার প্রশ্ন করেছিলেন, মিসেস ব্যাটরা কে, চিনতে পারলাম না তো।
-মিসেস ব্যাটরা! উনি তো স্যামন কোম্পানির এজেন্ট। ‘স্যামন' কোম্পানির নাম শুনেছেন তো? ওদের প্রোডাক্ট দোকানের কাউন্টারে পাওয়া যায় না। শুধু এক্সক্লুসিভ প্রাইভেট কাস্টমারদের জন্যে। দারুণ সব কসমেটিকস।
-বেশি দাম না? ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞাসা অলকার।
-তা একটু তো হবেই। এই ধরুন এভরি ডে ইউজের ময়শ্চারাইজার, ৫০ এম এল-এর দাম ২০০ টাকা, ১০ এম এল এতটুকু আন্ডার আইক্রিম ৩৫০ টাকা, ডে ক্রিম এত, শ্যাম্পু এত...... অলকা স্তম্ভিত। বাজার ভর্তি অর্ধেক দামের প্রসাধনী। তিনি নিজে দোকান থেকে কিনে ব্যবহার করেন ময়শ্চারাইজার, শ্যাম্পু, ফেস ওয়াশ কত কী। অথচ তিনি জন্মেছেন সম্পন্ন ঘরে, বিয়ে হয় উচ্চপদস্থ পাত্রের সঙ্গে। রুনু একেবারে গেরস্থ ঘরের মেয়ে হয়ে এত খরচে! তার মা-মাসি-পিসি কেউ কলেজের চৌকাঠ পেরোয়নি। বাবা-জ্যাঠা এমনকী নিজের দাদা পর্যন্ত আধুনিক উচ্চশিক্ষাভিত্তিক কোনও পেশায় নেই। ব্যবসা, ঠিকেদারি ইত্যাদিতে জীবিকার্জন। তাই তো অলকার এই সম্বন্ধতে রীতিমতো খুঁতখুঁতানি ছিল। প্রথম আলাপে হবু বেয়ান বললেন, আমাদের দু'দিকেই বড় ফ্যামিলি, আমরা হলাম তিন বোন তিন ভাই। এঁরা চার ভাই দুই বোন। পড়াশুনো তাই বেশিদূর যায়নি। মেয়েদের তো ইস্কুল পেরুলেই বিয়ে আর রান্নাঘর। তখন আবার কয়লার উনুন। সে যে কী কষ্ট। আমার একটা মেয়ে—এখন তো সকলেরই ছোট পরিবার। যত্ন করে লেখাপড়া শিখিয়েছি যাতে মায়ের মতো হাঁড়ি ঠেলতে না হয়।
কথাগুলো শুনে অলকা বলেছিলেন পরে দীপককে, এঁরা কিন্তু আমাদের ক্লাসের নন।
-সমাজে নানা শ্রেণি থাকে। এক শ্রেণির সঙ্গে অন্য শ্রেণির সম্পর্ক কি নিষিদ্ধ না অসম্ভব? তাছাড়া আজকাল অত শ্রেণিবিচার চলে না। তাঁর মতে ছেলের যখন পছন্দ তখন আর কিছু ভাবার দরকার নেই। আসলে দীপকের চাকরি উপলক্ষে তাঁরা দীর্ঘকাল স্ব-সমাজের বাইরে। নিজেদের পরিবারের স্বল্পসংখ্যক সদস্যরা তাঁদেরই মতো ছড়িয়ে গেছেন সারা ভারতে এবং বিদেশে। পশ্চিমবঙ্গের বাসিন্দা আত্মীয়স্বজন বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে যোগাযোগ ক্ষীণ। ছেলের বিয়ের জন্য পাত্রী খোঁজার প্রয়োজন দেখা দিলে তাঁদের নিজেদের বেলায় যেমন একই সামাজিক বৃত্তে জানাশোনার মাধ্যমে পরিকল্পিত আলাপ পরিচয় ঘটানো হয়েছিল, তেমনটি আর করা সম্ভব হল না। তাঁরা বাবা-মা'র যত ঘনিষ্ঠ ছিলেন ছেলে কি তাঁদের তত কাছে? ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ার সময় থেকেই বাড়ির বাইরে। সে সময়টা তাঁরা আবার বদলি হয়ে গেছেন অন্য রাজ্যে। নিলুর পাশ করে দিল্লি, আহমেদাবাদ, পুনেতে পর পর চাকরি-বিশ্বায়নের দৌলতে আজকাল কাজের স্থায়িত্ব বড় কম। তাঁরা এর মধ্যে ভূপাল, লখনউ, গুয়াহাটি ঘুরে অবসরপ্রাপ্ত হয়ে কলকাতায় ফিরলেন। নেহাত ভাগ্যক্রমে মুম্বইয়ের এক সংস্থার কলকাতা শাখায় স্থিতিলাভ নিলুর। অতঃপর কাগজে বিজ্ঞাপন তথ্যকেন্দ্র ইত্যাদি মারফত পাত্রী সন্ধান। অলকার প্রায়ই মনে হয় এত বছর বাড়ির বাইরে বাস করে নিলু কেমন পালটে গেছে। নইলে সুবোধ মজুমদারের পরিবার ও তাঁর কন্যা নন্দিতা ওরফে রুনুকে পছন্দ হল কী করে। মেয়ে দেখতে গিয়ে অলকার প্রথমেই চোখে পড়ে ছিরিছাঁদহীন ঘরদোর, মুখের সামনে টাঙানো ঘন সবুজ রঙের পর্দা। যেমন তেমন সোফাসেট- বসলে ডেবে যায়—একমাত্র দেওয়ালশোভা গণেশের ছবিওলা ক্যালেন্ডার। অলকা নিজে যাযাবরের মতো সারা গৃহস্থালি কাঁধে করে ঘুরেও গৃহসজ্জার হাজারটা টুকিটাকি বয়ে বেরিয়েছেন। দু'তিন বছর পর পর নতুন সংসারেও পর্দা থেকে কুশন, ঘরের রং থেকে বেডকভার ম্যাচিং তাঁর পরিপাটি। মেঝের এককোণে স্ট্যান্ডিং ল্যাম্প। ওইখানে বাঁকুড়ার মাটির ঘোড়া। দেওয়ালে যামিনী রায়ের প্রিন্টের দিকে চোখ বুলিয়ে অফিস ফেরত স্বামী তাঁর নির্দিষ্ট প্রিয় মিনি আরামকেদারায় বসে পড়ে প্রসন্ন মুখে বলেছেন, যাক, সেল করা গেল। সেই বাপের ছেলে হয়ে নিলু কী করে এমন রুচিশূন্য আদ্যস্ত বৈষয়িক মানুষজনকে আপন ভাবতে চায়? রুনুর নেইলপলিশ লাগানো ম্যানিকিওর করা হাত দুখানা দেখেই তিনি বুঝে গেছেন এ মেয়ের সংসারের কাজে মন নেই। তাঁর আশঙ্কা উড়িয়ে দিয়েছেন দীপক, আরে নখ কেটে ফেলতে কতক্ষণ। তাছাড়া বিদেশে তো মেয়েরা নখটখ নিয়েই সব কাজকর্ম করে।
আসলে অলকার ভারী পছন্দ ছিল অন্য সম্বন্ধটি। ঠিক তাঁদের মতো শিক্ষিত পদস্থ চাকুরে পরিবার। মেয়েটি কলেজের অধ্যাপিকা। চেহারা আহামরি নয় (রুনুই বা কী এমন ফুটন্ত সুন্দরী) কিন্তু খুব গুণের। আশ্চর্য, ছেলে কিছুতেই রাজি হল না। ভালো ছাত্রী, নির্ঘাত সেট আইডিয়াজ মাথায় থাকবে।' রুনুর তো মাথায় কোনও আইডিয়াই নেই। খালি সাজগোজ, বাপের বাড়ি, এখানে-ওখানে ঘোরা, ব্যস। যেন বারো-তেরো বছরের কিশোরী, বয়েস এদিকে তিরিশের ওপারে। মাঝে মাঝে অলকার কেমন অস্বস্তি হয়। নিজের পেটের সন্তান যেন অপরিচিত। দীপক অবশ্য বলেন, যা দিনকাল, ছেলেরা সমকক্ষ মেয়েকে ভয় পায়।
আহা, যেন সমকক্ষ না হলেও কিছু কম ভয় পায় বউকে নিলু। এই তো বিয়ের পর পরই একটা ঢাউস মিউজিক সিস্টেম কিনে এনে ঘরে বসাল। একেই তো জামাকাপড়ে ঘর ঠাসা, টিভিটা ঠিকমতো রাখতে প্রায় জায়গা হয় না। কী দরকার ছিল। ওটা বাজাবেই বা কখন। রাতে ঘুমবার আগে দু'তিন ঘণ্টা তো সিরিয়াল দেখেই কাটে। কী না, রুনুর বরাবরের শখ। অন্য কোনও শাশুড়ি হলে বলে ফেলতেন এতদিন বাপের বাড়িতে শখ মেটাতে পারনি, এ বাড়িতে পা দিতে না দিতেই জীবনের সব সাধ মিটিয়ে ফেলতে হবে।' হ্যাঁ, তাই। হানিমুনে দার্জিলিং, ঠিক আছে। কিন্তু প্রত্যেক বছর যেকটা দিন ছুটি দু'জনে একসঙ্গে পায় শুধু শ্বশুরবাড়ির সম্পর্কের অমুক তুতো তমুক তুতো দাদা, দিদিদের সঙ্গেই কুলু মানালি বা উদয়পুর জয়পুর যেতে হবে? বেয়াইমশাই প্রায়ই ব্যাবসা সূত্রে মুর্শিদাবাদ যান শুনে দীপক কথায় কথায় বলেছিলেন, চলুন, একবার দুই পরিবার মিলে বেড়িয়ে আসা যাক। আমরা তো মুর্শিদাবাদ দেখিনি, মেয়ের হাত দিয়ে মুর্শিদাবাদের একটা হোটেলের কার্ড পাঠিয়ে দিয়েছিলেন সুবোধ মজুমদার। অলকা শোনাতে ছাড়েননি তাঁর ভালোমানুষ স্বামীকে, কেমন, হল তো। ওরা ভেবেছে মেয়ে পক্ষের টাকা খসানোর মতলব আমাদের। অথচ অতিরিক্ত ভদ্রতা দেখিয়ে তাঁরা বিয়েতে খাট-বিছানা-আলমারি ইত্যাদি দানসামগ্রী নেননি, নিজেদের ছেলের শোবার ঘরে দেওয়ালজোড়া আলমারি, দু'জনের বক্সবেড, ড্রেসিং টেবিল তৈরি করিয়েছেন। বিয়ের পর-পরই অলকা তাদের নামে করে দিয়েছেন ব্যাংকে আলাদা লকার–লকার পাওয়া কম দুর্ঘট, সেই কবে থেকে অ্যাপ্লাই করে রেখেছিলেন। মোটা ডিপোজিট তো দেওয়া আছেই। তবুও নিলুর ভাবভঙ্গিতে মনে হয় যেন রুনুর জন্য যথেষ্ট করা হচ্ছে না। ঠিক ওর বাপের বাড়ির মতো স্বাচ্ছন্দ্য এ বাড়িতে পায় না। যাকগে আর এসব ভাববেন না। দীপক প্রায়ই বলেন, তোমাকে সংসার গড়ে তুলতে হয়েছে। এরা রেডিমেড পাচ্ছে। তফাত তো হবেই।
স্বাভাবিক মুখেই সুনন্দার মেসেজ নিলেন অলকা। বাকি অর্ধেক ঠান্ডা চা-টা শেষ করে শেফালিকে ডেকে সাবানগুঁড়ো বের করে দেন। ধোয়া জামাকাপড়ের কোনগুলো বেশিক্ষণ ভেজাতে হবে, সাবান মাখিয়ে কোন কোনটা সঙ্গে সঙ্গে কাচা দরকার বিস্তারিত নির্দেশ। বেশিরভাগই তো নিলু আর রুনুর, তাঁদের আর ক'টা। ওরা সারাদিন বাইরে থাকে। এসিতেও ধুলোময়লা তেল ঘাম এড়াবার উপায় নেই। যাতায়াত তো আছে।
-আর একটু চা আছে পটে, নেবে? আগের কাপটা তো ঠান্ডা জল হয়ে গেল।
দীপক বলেন, তুমিও একটু নাও। চা ঢালেন অলকা। দরজায় বেল। চতুর্থবার। এবারে তাঁদের জমাদার এবং দীপকের খবরদারির পালা।
-ফির তুম ইতনা জলদি আয়া। হামলোগকা নাস্তা খতম নেহি হুয়া। দাদা-বউদিকা নাহানোকো টাইম ভি ইয়াদ নেহি?
-দশ বাজে আঁউ? নির্বিকার প্রতিক্রিয়া কিষেনলালের অর্থাৎ কিষর। অলকা হাঁ হাঁ করে ওঠেন। ওর দশটা মানে নির্ঘাত এগারোটা। তখন তো দীপক বেরিয়ে যাবেন তাঁর কনসাল্টেন্সিতে। অলকার কি নিজের কাজকর্ম নেই। বরং তাঁদের বাথরুমটা ধুতে শুরু করুক। ভিম পাউডার, ফিনাইল হাতে দীপক চলেন কিষর সঙ্গে।
-আমাদের বাথরুমটা হয়ে গেলে একবার নিলুদের ঘরে হাঁক দিয়ে দেখো যদি ক’মিনিটের জন্য খুলে দিতে পারো। নইলে গুদের বাথরুমটা ধোয়াই হবে না।
অলকা চায়ের কাপ হাতে উদয় হন রান্নাঘরে। লাউটা মিহি করে কাটা হল কি না, মাছটা যেন ঠান্ডা বরফ অবস্থাতেই তেলে না ছাড়ে, ধনে-জিরে গুঁড়ো একটু পেষা দরকার নইলে ঝোল ঠিক হয় না-
-ও মা, তুমি এসো না, আমি স-ব করে নেব।
কত তুমি করে নেবে আমার আর জানতে বাকি নেই। মনে মনে বলেন অলকা। অর্ধেক খোসাওয়ালা গোদাগোদা কাটা তরকারি। ইটের মতো শক্ত মাছ, দানা দানা কালাভাসা ট্যালটেলে ঝোল। মুখে দেওয়া যায় না। নেহাত তাঁর গরম সহ্য হয় না তাই লোকের হাতে রান্না খেতে হচ্ছে।
সোম থেকে শুক্র প্রতিদিন সকালে রান্না নিয়ে রোজ টেনশন। তাঁর সংসারে কোনোদিন সকালে ভাত খাওয়ার চলন ছিল না। দীপক চিরকাল সকালে পাউরুটি ডিম কলা খেয়ে যেতেন, দুপুরের জন্যে সঙ্গে যেত ফল ও ছানা। কখনও বা স্যান্ডউইচ, শশা টমেটো, লেটুস বা চিজ দিয়ে। নিলুরও স্কুল ছিল সকালে। ব্রেকফাস্ট খেয়ে যেত—তাই খেতেই কী যন্ত্রণা না দিত। দুপুরে ফিরে এসে ভাত। ইঞ্জিনিয়ারিং-এর সময় তো হোস্টেলেই ছিল। এখানে চাকরিতে জয়েন করে অফিসের ক্যান্টিনে খায় (সাবসিডাইজড লাঞ্চ, বুঝলে মা, না খেলে কোম্পানিরই লাভ)। বিয়ের পর সব পালটে গেছে। রুনুর কাজের সঙ্গে মিলিয়ে নিলুর নিজের রুটিন। ওদের বাড়িতে সকালে ভাত খেয়ে সবাই স্কুল কলেজ অফিসে যায়। এ বাড়িতে ও বাড়ির নিয়ম চালু হবে কেন— এ প্রশ্ন অলকা বা দীপক কেউই তোলেননি। তাঁরা সর্বদা মনে রাখেন যে আজকের দিনে ছেলের বাপ-মা হওয়ার ঝুঁকি প্রচুর। তাছাড়া ট্র্যাভেল এজেন্সিতে কাজ রুনুর, অফিস ল্যান্সডাউনে রেসিডেনশিয়াল পাড়ায়। ওখানে হাতের কাছে শুধু স্ন্যাক্স। পুরো খাবার সুব্যবস্থা কোথায় পাবে। অতএব স্বামী-স্ত্রী দু'জনে সকালে একসঙ্গে খেয়ে বেরিয়ে যায়। (এখন কোম্পানির লাভে নিলুর আপত্তি নেই)। যেদিন শোভার মা বা শেফালি কামাই করে— মাসে অন্তত ৪-৫ দিন এবং বিনা নোটিশে করবেই—সেদিন অলকা চোখে অন্ধকার দেখেন।
-এ কী মাসি আসেনি? বেজার মুখে রুনু নিজেদের চা ও কমপ্ল্যান নিয়ে শোবার ঘরে ঢুকে যায়। অলকা টোস্ট খেতে খেতে—সকালে সলিড কিছু না খেলে আবার তাঁর গ্যাস হয়-ডালটা প্রেশার কুকারে বসিয়ে দেন। চা খাওয়ার সঙ্গে চাল ধোয়া। তাঁর তরকারি কোটার সময় রুনু অপ্রসন্ন মুখে চায়ের ও কমপ্ল্যানের খালি কাপ দুটো রেখে বলে, মা আমি মাছটা ভেজে দিই? যদি কখনও সবগুলো মাছ ভাজতে হয় তাহলে নির্ঘাৎ না খেয়ে অফিস চলে যাবে (বড্ড দেরি হয়ে গেল বাইরে কিছু খেয়ে নেব, নিলয়, তুমি ক্যান্টিনে সকালে কিছু পাবে তো?) অলকা যেন মরমে মরে যান। সেদিন তাঁর আর মুখে ভাত রোচে না। অতএব শোভার মা ও শেফালিকে তিনি যথাসাধ্য নরমে-গরমে রাখেন। এরা বাড়িতে না ঢোকা পর্যন্ত তাঁর যে কী টেনশন।
-ইস, আগুনের মতো গরম সব। শোভার মা, তুমি যদি একটু আগে আসো তাহলে এদের মুখ পুড়িয়ে খেতে হয় না। সুসজ্জিত ছেলে ও ছেলের বউকে ভাত ডাল মাছ তরকারি বেড়ে দিতে দিতে রান্নাঘরের উদ্দেশ্যে বলেন অলকা। বলাবাহুল্য উত্তর আসে না। চামচ দিয়ে ধোঁয়া ওঠা ভাত ডাল স্টিলের থালায় ছড়িয়ে ঠান্ডা করতে থাকেন অলকা।
দরজায় বেল। পঞ্চমবার। ইস্তিরির হিন্দুস্তানি ছেলেটা। দীপক জিজ্ঞাসা করেন, তোমাদের কি ওকে কিছু দেওয়ার আছে?
নখে নেইলপালিশ লাগানো পরিপাটি আঙুলে আলতো করে ভাত তুলতে তুলতে রুনু বলে, টিভির ওপরে ইস্তিরির কাপড় রাখা আছে। যেন সেগুলো হেঁটে হেঁটে দরজায় পৌঁছে যাবে।
-শেফালি, দাদা-বউদির কাপড়গুলো নিয়ে এসো তো। গুনে দিতে গিয়ে দেখেন যথারীতি প্যান্টের হুক খোলা, শার্টের বোতাম ভাঙা।
-দ্যাখো, এইরকমই যাবে ইস্তিরিতে?
মাছের কাঁটা বাছতে বাছতে নিলয় বলে, আমার বেশ ক'টা শার্ট প্যান্টের বোতামটোতাম ভেঙেছে।
-কতবার বলেছি, বাজারে যে সস্তার দরজিগুলো বসে তাদের কাউকে দিয়ে লাগিয়ে নাও। তা না, বাবুর সময়ই হয় না। রুনু মুখভর্তি লাউঘণ্ট চিবোতে চিবোতে উপদেশ দেয়। এটা এদের প্রচলিত বাক্যালাপ। প্রথমবার শুনে অবাক হয়েছিলেন অলকা। তিনি তো স্বামী-পুত্রের শার্ট প্যান্টের ছেঁড়া বোতাম হুক বরাবর নিজেই সেলাই করে দিয়েছেন। প্রায় মুখে এসে গিয়েছিল, একসঙ্গে করে দিস আমি লাগিয়ে দেব'খন। বলেন না। পই পই করে দীপক বলেছেন, ওদের জীবন ওদের মতো করে চালাতে দাও, তুমি মাঝখানে গিয়ে পড়ো না'।
-কিন্তু অকারণ অপব্যয়
-কার অপব্যয়? যাদের টাকা তারাই যদি অপব্যয় না মনে করে তুমি কে বলার?
সেইজন্যেই তো যখন দেখলেন রুনুর শুধু সালোয়ার, চুড়িদার, নাইটি ইস্তিরিতে যায় এবং সব কামিজই মিসেস কাপুরের বুটিকের এমব্রয়ডারি অতএব ড্রাইওয়াশ করা হয়, তিনি মনে মনে হিসেব কষেও কিচ্ছুটি মুখ ফুটে বলেননি। তবু বউমার সাজপোশাক কসমেটিকস, বিউটি পারলার হরদম ট্যাক্সিতে যাতায়াত কিছুদিন ধরে দেখে দেখে ছেলেকে একবার একা পেয়ে জিজ্ঞাসা করে ফেলেছিলেন, হ্যাঁরে, রুনু অনেক টাকা রোজগার করে, না?
নিলয় উদাসীন মুখে জবাব দিয়েছিল, কী জানি। এমন তো আহামরি ট্র্যাভেল এজেন্সি নয়। বাঙালি মালিকানা, এই তো বছর দশ-পনেরো ধরে খুলেছে। আর রুনু তো ট্র্যাভেল ট্যুরিজমের কোনও কোর্স-টোর্স করেনি। ইংলিশ মিডিয়ামে পড়েছে, ইন্টারনেটটা শিখেছে। ও ওই রিসেপশন এনকোয়ারি এইসব দেখে আর কী। তাতে মোটা মাইনে তো পেতে পারে না।
-মানে তুই জানিস না ও কত রোজগার করে? তোর রোজগার তো ও দেখি পাইপয়সা অবধি জানে।
-দেখো মা, ওসব জিজ্ঞাসা করা যায় না। ভুল বোঝাবুঝি হয়। ওর উপার্জন সবটাই ওর। মেয়ে দেখার সময় হবু বেয়াই রুনুর উপার্জন প্রসঙ্গে বলেছিলেন, লেখাপড়া শিখেছে তাই চাকরি করে। পকেট খরচ আর কী।অলকার কানে খট করে কথাটা বেজেছিল। নিলয় চাকুরে মেয়ে ছাড়া বিয়ে করবে না দৃঢ়প্রতিজ্ঞ (আজকাল দু'জনের উপার্জন ছাড়া ভালো স্ট্যান্ডার্ডে থাকা যায় না')। সেটা কি শুধু স্ত্রীর হাতখরচ জোগানোর অক্ষমতার জন্যে? অলকার প্রজন্মের ছোটবেলায় স্বপ্ন ছিল স্বাবলম্বী হবেন। স্কুলে যখনই টিচাররা রচনা লিখতে দিতেন ‘বড় হয়ে কী হতে চাও', ক্লাসসুদ্ধু মেয়ে ডাক্তার, উকিল, অধ্যাপিকা কত কী হওয়ার বাসনাকামনা প্রকাশ করত। নিজের পায়ে দাঁড়াব, পুরুষের মুখাপেক্ষী থাকব না— সকলের উত্তরে একই কারণ ব্যাখ্যা। এম এ পাশ করে অলকা নিজে দু'বছর কলেজে পড়িয়েছেন। বিয়ের পরও একবছর। দীপকের বদলির চাকরির জন্যে যখন ছেড়ে দিতে হল, বিমর্ষ পুত্রবধূর পিঠে সস্নেহে হাত রেখে শ্বশুরমশাই বলেছিলেন, 'মা, সুগৃহিণীর কোনও বিকল্প নেই। একটা সুন্দর সংসার গড়ে তোলায়, দু'চারজন মানুষকে সুখী করায় কি কম বুদ্ধি, কম পরিশ্রম, কম দক্ষতা লাগে? যে দেশে, যে সময়ে মেয়েরা টাকা রোজগার না করলে জীবন ব্যর্থ ভাবে সে দেশ বড় দুর্ভাগা, সে সময় সত্যি দুঃসময়।' খেদ ঝেড়ে ফেলে সংসারে মনপ্রাণ ঢেলেছেন অলকা। হ্যাঁ, সুবিধেমতো কখনও সমাজসেবামূলক প্রতিষ্ঠানে যুক্ত থেকেছেন। পড়িয়েছেন ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে দু'তিন বছর করে কোনও কোনও শহরে। এখনও তাঁদের এই ঢাকুরিয়ার 'অজন্তা' আবাসনের মহিলা সমিতির তিনি অন্যতম কর্ণধার।
ষষ্ঠবার বেল বাজল। এবারে মাছওয়ালা। সপ্তাহে দু'দিন। সবজিওয়ালা প্রতিদিন, অবশ্য পরে আসে। সামনে দাঁড়িয়ে মাছ বেছে কাটিয়ে গুনে শোভার মাকে দিয়ে ধুইয়ে তিন দিনের দু'বেলা হিসেবে ভাগ ভাগ করে পলিথিনে মুড়ে ফ্রিজারে তোলেন। খাওয়ার টেবিল থেকেই নিলু মন্তব্য করে, উফ্ পোনা মাছ খেয়ে খেয়ে পেটে চড়া পড়ে গেল। পারশেটারশে, ট্যাংরা আনতে পারো না?
-উঁ সব মছলি বহুত দাম, কে লিবে না লিবে ঠিক নাই। তাই হামি আনে না। পেটির পুরু ছালটা খালার একপাশে সরিয়ে রেখে উঠে পড়ে রুনু।
-আমাদের বাড়িতে দু'দিন এক মাছ কেউ ছোবেই না। বাবা রোজ সকালে বাজার থেকে রকমারি মাছ আনেন।
অর্থাৎ দীপকের বাজার না করার জন্যে তাদের এই একঘেয়ে খাওয়া। সারা কর্মজীবন দীপক থেকেছেন পশ্চিমবঙ্গের বাইরে বিভিন্ন শহরে। বাড়ির কাছে না ছিল বাজার, না ছিল প্রতিদিন মাছের জোগান। সাইকেলে করে কাজের লোক যা আনত তাই খাওয়া। সত্যিকথা বলতে কী অলকা বা দীপক কেউ ভোজনবিলাসী নন। অল্প ঝামেলায় স্বাস্থ্যসম্মত খাদ্য হলেই হল। এ বাড়িতে নিলু প্রতি রবিবার শখ করে বাজারে যেত, আনত চিতল, ইলিশ, মাগুর, তপসে। বিয়ের পর থেকে তার রবিবার বাজারে যাওয়া বন্ধ। উইকএন্ডে দু'জনে গড়িয়ায় শ্বশুরবাড়িতে কাটায়। বুধ-বিষ্যুৎ রাত থেকেই ফোনালাপ ঘনঘন, শনিবার রাতে অমুক পিসির, রবিবার দুপুরে তমুক মাসি বা জ্যাঠতুতো খুড়তুতো নিজের বা দুধাপ দূরে দাদা-দিদি-ভাইদের আগমন বিদায় অসংখ্য কারণে নিমন্ত্রণ তাদের লেগেই থাকে। বেহালা থেকে বেলঘরিয়া, হাবড়া থেকে হালতু খানেই নিমন্ত্রণ থাক না কেন রাত্রিবাস রুনুর বাপের বাড়ি উয়ায়। এই তিন বছরে দীপকের ব্রংকাইটিস, অলকার ম্যালেরিয়া, এখানে-ওখানে ব্যথা, জ্বরজারি পেট খারাপ কোনও ছুতোতে ছেলে-ছেলের বউয়ের উইকএন্ডের প্রোগ্রামের এতটুকু নড়চড় হয়নি।
রাতের জন্যে পটোলের দোলমা আর আলুর টিকিয়ার জোগাড়ে গেলেন অলকা। মাছটা ভাপাতে দিয়ে আলু প্রেশারে বসিয়ে শোভার গজগজ, এসব ফ্যাচাংয়ের পদ কি ঠিকে লোকের কম্ম।
-ঠিক আছে, তুমি শুধু পরোটা করো আর আলু সেদ্ধটা ছাড়িয়ে রখে যাও। বাকি আমি করে নেব। এদিকে নিলুরা যথারীতি রুমের এক হাট করে রেখে গেছে। সব জিনিস ছড়ানো-ছিটোনো। সেই সুযোগে শেফালি যে নমো নমো রে কাজ সারবে সেটি হবে না। অলকা তার পিছনে আছেন, কটিক করতে। কাজের লোক বিদেয় হলে নিজের কোমরের ব্যায়াম সেরে স্নান। দীপক তো তাঁর পার্টটাইম কনসাল্টেন্সিতে চলে গেছেন কখন। দুপুরে ফিরলে দুজনের খাওয়াদাওয়া বিশ্রাম। তার মধ্যে ডাকপিয়ন, ক্যুরিয়ার, ক্যানভাসার সামলানো।
বিকেলে চা করে খেয়ে ধোপার কাছ থেকে নিলুদের জামাকাপড়গুলো নিয়ে—ওঁদের আর ক'টাই বা হয়— দু'জনে পদভ্রমণে বেরোন। সে সময় পাড়ার দোকান থেকে মাংস ফলটল সংসারের টুকিটাকি কেনা। দুটো বাথরুমেরই সামনে পাপোশ পালটাতে হবে। সন্ধেয় ফিরে পটোলের পালমা, আলুটিকিয়া, জিরারাইস রান্না করে গা-টা ধুয়ে বসেন।
-এই গরমে তুমি আবার কেন এসব হাঙ্গামার মধ্যে গেলে।
-ওরা একঘেয়ে হয়ে গেছে। মাছ খেতে চায় না, তাই একটু করলাম। রাত প্রায় ন'টা। এখনও ময়নার বাড়ি থেকে রুনুরা ফিরল না। নাকি কখন এসে যথারীতি নিজেদের ঘরে বসে টিভি দেখছে, রাত সাড়ে দশটায় খেতে বেরবে। না, টিভি'র আওয়াজ তো নেই। উঠে দেখতে যাবেন, এমন সময় ক্রিং ক্রিং ক্রিং।
-হ্যালো।
-মা, নিলু বলছি। শোনো আমি আর রুনু ময়নাদির বাড়িতে। হ্যাঁ, তুমি জানো। সুনন্দাদি পিকলুদা আমরা খাবার-দাবার নিয়ে এসেছি। এখানে সবাই মিলে খাব। তোমরা ওয়েট কোরো না। আর শোনো এখান থেকে গড়িয়া কাছে তো, রাত্রে ওখানেই থেকে যাচ্ছি। আজ তো শুক্রবার, ফিরব রবিবার রাত্রে খেয়েদেয়ে।
অলকা শুধু বলেন, আচ্ছা।
-কী হল? ওদের উইকএন্ড খেয়াল করোনি বুঝি? এ বাড়িটা ওদের কাছে হোটেল। কিছু টাকা নিলু সংসার খরচে দেয় তার বদলে নিজেদের ম্যাক্সিমাম সুবিধেটা চাই। কবে বুঝবে এ কথা?
অলকা চুপ। একটু পরে আস্তে আস্তে বলেন, তবু তো দিনে ক'মিনিট দেখা হয়। জানো, মেজদার শালা সেই ডাকসাইটে বলুদা, যার দুই ছেলে আমেরিকায় আছে। তিনি ফ্ল্যাটে মরে পড়েছিলেন দু'দিন। শেষে সিকিউরিটির লোক কাজের মেয়ের কথায় দরজা ভেঙে ডেড বডি বের করে। আমরা অন্তত বাসি মড়া হব না।
-ভগবানের কাছে তাহলে একটা পিটিশন করা যাক।
-কী পিটিশান?
-সোম থেকে শুক্রর মধ্যে যেন মরি।

No comments