জ্যান্ত হলো ছবির বিড়াল - সুস্মিতা নাথ Janto Holo Chobir Biral by Susmita Nath
নাহ্! নিজের চোখকেই বিশ্বাস করতে পারছেন না সোমদেববাবু। এই তো, ঠিক এখানেই তো ছিল ওটা ! ডান দিকের হলদে বাড়িটার ছাদে লেজ বেঁকিয়ে গোঁফ ফুলিয়ে। অথচ এখন সেটা বেমালুম গায়েব? বাদবাকি যা যেমন ছিল, সব অবিকল একই আছে। কোথাও কোনও বিচ্যুতি নেই। আর বিচ্যুতি ঘটবেই বা কী করে? কেউ কি কখনও শুনেছে যে ছবির থেকে আস্ত বিড়ালই ভ্যানিশ হয়ে গেছে? একি ম্যাজিক নাকি?
কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়ল সোমদেববাবুর। শরতের হিমেল সকালেও বেশ টের পেলেন, তিনি ঘামছেন। ব্যাপারটা ঠিক কী হল, কিছুতেই বুঝতে পারছেন না তিনি। সারা জীবন ধরে এত ছবি এঁকেছেন, এখনও এঁকে চলেছেন, কিন্তু কখনও এমন অদ্ভুত পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হয়নি। এই তো তাঁর এই স্টুডিয়োর ভেতরেই তো থরে থরে সাজানো অসংখ্য ছবি। সে সব ছবিতেও তো...। ভাবতে ভাবতে পাশের ছবিটির দিকে এগিয়ে যান তিনি। থমকে দাঁড়ালেন! এখানেও নেই? আশ্চর্য! শিরশিরে একটা অনুভূতি তাঁর শরীর বেয়ে নেমে গেল। ছুটলেন অন্যান্য ছবিগুলোর দিকে। আর সবিস্ময় আতঙ্কে দেখলেন, সব ছবিতেই একই কাণ্ড! কোনওটাতেই তাঁর সাধের বেড়ালটি নেই!
দরদর করে ঘামতে লাগলেন সোমদেববাবু। গলা শুকিয়ে কাঠ। নবমীর ঢাকের বাদ্যির মতো শোনাচ্ছে বুকের ধুকপুকানি। হাঁটু জোড়া বেজায় নড়বড়ে ঠেকছে। দাঁড়াতেই যেন পারছেন না। মাথায় হাত দিয়ে চেয়ারে বসে পড়লেন তিনি।
এ নিশ্চয়ই বলার অপেক্ষা রাখে না যে, এই সোমদেববাবু হলেন বিখ্যাত চিত্রকর সোমদেব সোম। দেশের সীমানা ছাড়িয়ে বহির্বিশ্বের দূর-দূরান্তেও তাঁর খ্যাতি ছড়িয়েছে। পঞ্চাশ বছরেরও বেশি সময় ধরে ছবি আঁকছেন তিনি। দেশ-বিদেশের প্রদর্শনীতে যোগদান করেছেন। অন্যান্য অনেক শিল্পীর ছবির মতোই তার আঁকা ছবিরও কিছু বৈশিষ্ট্য আছে। এদের মধ্যে একটি হল, তাঁর সব ছবিতে একটা বিড়াল থাকবেই থাকবে। সে গ্রাম বাংলার ছবিই হোক বা মহানগরের কোনও দৃশ্যপট, মাঠ ময়দানের ছবি বা ঘরের অন্দরমহলের ছবি হোক না কেন, বিড়াল সর্বত্র বিরাজমান। তবে সবই বড় মার্জিত ধরনের। ভদ্র, শান্ত, ভাজা মাছ উল্টে খেতে না জানা অবোধ জীব। দাঁত খিঁচুনি নেই, রেগে গোঁফ ফুলিয়ে চোখ রাঙানি নেই, লেজ তুলে তর্জনগর্জন নেই। তুলতুলে ছটফটে লক্ষ্মীমন্ত দুষ্টুমিষ্টি বলতে যা বোঝায় তাঁর বিড়ালেরাও সেরকমই। সোমদেববাবুর মতোই তার সৃষ্ট বিড়ালেরাও খুব জনপ্রিয় বিশিষ্টজন বা সেলিব্রিটি হওয়ার হ্যাপাও আছে। প্রায়ই সোমদেববাবুকে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ রাখতে যেতে হয়। সর্বসমক্ষে ছবিও আঁকতে হয়। ক্যানভাসে তুলির আঁচড় দিতে না দিতেই উপস্থিত দর্শকেরা চেঁচিয়ে উঠে বলে, ‘বিড়াল থাকছে তো স্যার?' সোমদেববাবু তখন মাথা নেড়ে অমায়িক হেসে তাদের আশ্বস্ত করেন।
না, তিনি কখনই তাঁর বিড়ালকে ভোলেন না। গতকাল মধ্যরাতেও যে ছবিটা শেষ করেছেন, ওটিতেও যথারীতি বিড়াল এঁকেছিলেন। কিন্তু সকালে যখন ফের স্টুডিয়োতে এলেন, তখন রাতের আঁকা ছবিটা দেখে তিনি সত্যিই হতবাক হয়ে গেলেন। আর শুধু সেই ছবিই কেন, কোনও ছবিতেই তো বিড়াল খুঁজে পাচ্ছেন না! কিন্তু এটা কী করে সম্ভব? ছবির বিড়াল তো আর চুরি হতে পারে না। তাহলে হলোটা কী? তবে কি তিনি আজকাল বিড়াল আঁকতে ভুলে যাচ্ছেন? বয়স কি তবে জানান দিতে শুরু করল? নাকি অতিরিক্ত পরিশ্রমের দরুন মাথা ঠিক কাজ করছে না?
ভয়ানক বিভ্রান্ত সোমদেববাবু। কী করবেন ঠিক করতে পারছেন না । এ তো অদ্ভুত বিপদ হল! আগামী কালই এমারেল্ড আর্ট গ্যালারিতে তাঁর একক প্রদর্শনী শুরু হচ্ছে। এবারের প্রদর্শনী একটা বিশেষ থিম তথা বিষয় নিয়ে। ইদানীং সারা বাংলা জুড়ে মৎস্য উৎসব চলছে। বড় বড় হোটেল, রেস্তোরাঁ, অ্যামিউজমেন্ট পার্ক, ময়দান, সর্বত্রই উৎসবে মেতেছে মানুষ। তাঁর প্রদর্শনীর বিষয়ও হল এই উৎসব। তাই মাছ নিয়েই একের পর এক ছবি এঁকেছেন তিনি। প্রতি ছবিতে তিনি খাদ্যরসিক বাঙালির মৎস্যপ্রীতি ফুটিয়ে তুলতে চেষ্টা করেছেন।
কোনও ছবি গ্রাম বাংলার মাছ চাষের ছবি, তো কোনওটা মহানগরীর মাছ বাজারের চালচিত্র। কোনোটায় গিন্নিমার হেঁসেলে মাছের তরিপদ, তো কোনও ছবিতে আবার ফুটে উঠেছে উৎসব বাড়ির হরেক ব্যঞ্জনের ছবি। কোথাও আবার নানাবিধ মাছ নিয়ে পাচক ঠাকুর ভজহরির কেরামতির ছবি। এমনই অন্তত গোটা পঁচিশেক ছবি নিয়েই হবে প্রদর্শনী। আর হ্যাঁ, সব ছবিতেই তিনি নিশ্চিত রূপেই বিড়ালও এঁকেছিলেন। যেখানে গাঁয়ের বধূ মাছ কুটছে, সেখানে অনতি দূরেই লোলুপ চোখে বঁটির দিকে তাকিয়ে বসে আছে বিড়াল, মাছ বাজারে বিড়াল, উৎসব বাড়িতে বিড়াল, এমনকী ভজহরি ঠাকুরের মাছ নিয়ে কেরামতির ছবিতেও তাঁর পায়ের কাছে একটা বিড়াল দাঁড়িয়ে। ভজহরির দিকে করুণ চোখে তাকিয়ে যেন ভাবছে কখন একটা মাছ ভজহরির হাত ফসকে পড়বে, আর সেটা দিয়ে সে ব্রেকফাস্ট সারবে।
কাল যে ছবিটি এঁকেছিলেন, সেটি একটি ঘরোয়া সমাবেশের ছবি। ছাদের উপরে সামিয়ানা টাঙিয়ে প্লেটে প্লেটে রোস্টেড পমফ্রেট, চিংড়ির চপ, ভেটকির ফিলে ইন পুদিনা সস, ফিশ ফিঙ্গার, বোনলেস ভূনা ইলিশ, ফিশ কাটলেট, ইত্যাদি নানান মুখোরোচক মাছের পদ সাজিয়ে আড্ডা জমিয়েছেন একদল মহিলা। আর ছাদের সিঁড়ির মুখেই যেন আমন্ত্রণের অপেক্ষায় বসে আছে একটি বিড়াল। বিড়ালের পাশেই একটা মাছের কাঁটা দেখা যাচ্ছে। অথচ এখন সে ছবির বাকি সবকিছু একই থাকলেও বিড়ালটি নেই। সিঁড়ির সামনেটা একেবারে ফাঁকা ফাঁকা লাগছে। এমনকী মাছের কাঁটাটিও জায়গা মতোই আছে। কেবলই বিড়ালটা....
নাহ্, আর ভাবতে পারছেন না সোমদেববাবু। মাথা ঠিক রাখা যাচ্ছে না কিছুতেই। প্রভূত বিভ্রান্তি নিয়ে স্টুডিয়ো থেকে বেরিয়ে আসতে উদ্যত হলেন তিনি। আর ঠিক তখনই অবাক বিস্ময়ে দেখলেন একটা বিড়াল টুপ করে জানলা দিয়ে স্টুডিয়োর ভেতরে ঢুকে পড়ল। সাদার উপরে কালো ছোপ, ছোটখাটো রোগা চেহারা। মুখের বাঁ-দিক যেমন ধবধবে সাদা, ডানদিক তেমনই কুচকুচে কালো।
চমকে উঠলেন সোমদেববাবু। হুবহু তাঁর আঁকা বিড়ালের মতো। আরে! এই—এইতো সেই বিড়াল! তিনি যেমন অবাক তেমনই উচ্ছ্বসিত। তবে একেবারে ভ্যানিশ হয়ে যায়নি ওটা? স্টুডিয়োর আশেপাশেই ছিল! একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেন তিনি। বিড়ালটা তখন একটা ইজেল স্ট্যান্ডের পেছনে পুরোনো রঙের বাক্সের উপরে আরাম করে বসেছে। সোমদেববাবু ওটার দিকে এগিয়ে গিয়ে বলে উঠলেন, ‘ব্যাপার কী হে পুসিক্যাট, হয়ার হ্যাভ ইউ বিন?”
প্রশ্ন শুনে মুচকি হাসল বিড়াল। তারপর বলল, 'আই হ্যাভ বিন টু লন্ডন, টু সি দ্য কুইন '
সোমদেববাবুর চোখ ছানাবড়া। এটুকু সময়ের মধ্যে পুসি লন্ডন ঘুরে চলে এল? বেশ কথাও শিখেছে তো পুসি!
তাঁর মনের কথা বুঝেই হয়তো পুসি তখনও মিটিমিটি হাসছে। তারপর একটা লম্বা ঢেঁকুর তুলে সামনের দুই থাবায় মাথাটা নামিয়ে এনে বলল, ‘ভাবছি এবার কদিনের জন্যে সুন্দরবন ঘুরে আসব । অনেকদিন ধরেই ভাগনে যেতে বলছে।'
সোমদেববাবু এবারে সত্যিই হতভম্ব। বললেন, ‘আবার সুন্দরবন যাবে? কিন্তু কেন? '
‘কেন আবার? বেড়াতে!' খানিক বিরক্ত হয়ে বলল বিড়াল।
‘সে তো বুঝলাম। কিন্তু ওখানে থাকবে কোথায়? লন্ডনে না হয় মহারানির সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলে। নিশ্চয়ই তখন বাকিংহ্যাম প্যালেসে ছিলে। কিন্তু সুন্দরবনে আছেটা কে? ও তো শুধুই জঙ্গল।’
‘তুমি দেখি কিছুই জানো না হে বাপু। সুন্দরবনে যে আমার ভাগ্নে থাকে, সে খবর বুঝি রাখো না? অনেকদিন থেকেই সে আমাকে যেতে আমন্ত্রণ জানাচ্ছে। কিন্তু তোমার ছবির ফাঁদে আটকে যাওয়াই হচ্ছিল না। এবারে ঠিক করেছি ঘুরেই আসব। তাছাড়া আমার ভাগ্নেও তো যে-সে কেউ নয়। সে-ও রয়্যাল, মানে রাজকীয় ব্যাপার-স্যাপার। তাঁর প্রাসাদেই থাকব।'
‘রয়্যাল মানে? তুমি কি রয়্যাল বেঙ্গল টাইগারের কথা বলছ?’
‘হুম! এবারে একটু বুদ্ধি খরচ করে ঠিক বুঝেছ। সেই রয়েল বেঙ্গল টাইগারই হল গিয়ে আমার আপন ভাগ্নে। আমার পিসতুতো দিদির কাকা শ্বশুরের নাতনির বড় ভাশুরের মেজ শ্যালকের ভায়রা ভাইয়ের ছোট ছেলে। এবারে বুঝলে তো?”
নাহ্, সোমদেববাবু এখনও কিছুই বোঝেননি। তাঁর মাথা পুরো গুলিয়ে গ। সুন্দরবনের ভয়ঙ্কর রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার কিনা তাঁর নিরীহ গোবেচারা বিড়ালের আত্মীয়! এটা বিশ্বাস হয়? ‘কি-ক্বিন্তু...’ তুতলে তুতলে কিছু একটা বলতে যাচ্ছিলেন তিনি, তার আগেই বিড়ালটা বলে উঠল, “তুমি এমন অবাক হচ্ছ, যেন কথাটা প্রথম শুনলে! ছোট ছোট ছেলেমেয়েরাও জানে যে বিড়াল হল বাঘের মাসি, আর তুমি জানো না?'
সত্যি তো, একথা তো তারও অজানা ছিল না! তবু অত তলিয়ে কখনও ভেবে দেখেছিলেন? বিড়াল বাঘের মাসি হলে বাঘ তো বিড়ালের ভাগ্নে হবে, এটাই স্বাভাবিক। তিনি কেবল নীরবে মাথা দোলালেন।
বিড়াল তখনও বলে চলেছে, ‘দ্যাখো বাপু, আমি মানুষটা দেখতে ছোটখাটো হতে পারি, কিন্তু আমার বিরাট বিরাট সব কানেকশন। লন্ডনের মহারানির কথা, সুন্দরবনের ভাগ্নের কথা তো শুনলেই ! আরও বলি শোনো, মিশরীয় ন্যায় বিচারের দেবী মাফদেত আমার আত্মীয়া, আবার এদেশের মা ষষ্ঠীর বাহনও আমিই। এ ছাড়াও প্রফেসর শঙ্কুকে চেনো নিশ্চয়ই, তাঁর বিশ্বস্ত সহচর নিউটনও আমার জ্ঞাতিভাই। তাহলেই বোঝো।'
বিড়ালের কথা শুনে ভ্রু কপালে উঠেছে শিল্পীর। চোখের পলক ফেলতে ভুলে গিয়েছেন। দুই ঠোঁটের মাঝে ইংরেজির ‘ও’-এর মতো এত্তবড় হাঁ হয়েছে যে পিংপং বল সাইজের গোটা রসগোল্লা ভেতরে ঢুকে যাবে। তিনি ভেবে পাচ্ছেন না কী বলবেন! বিড়াল কি তাঁকে রাজা-রানি, বাঘ, এমনকী ঠাকুর দেবতার নাম করে ভয় দেখাতে চাইছে? কে জানে। সোমদেববাবুর মনের ভেতরে অনেক সংশয় ঢুকে গেছে। বলেই ফেললেন, ‘সবই তো বুঝলাম, কিন্তু ছবির বিড়াল বাইরে এলে কী করে, এটাই তো বোধগম্য হল না এখনও৷'
সোমদেববাবুর কথা শুনে বিড়ালের সে কী হাসি! যেন বোকার মতো বেজায় হাসির কথা বলে ফেলেছেন তিনি। হাহাহা-হোহোহো-হিহিহি করে হাসতে হাসতে মেঝেতে গড়াগড়ি দিল কিছুক্ষণ। তারপর বলল, ‘হযবরল পড়োনি বুঝি? পড়লেই দেখতে, ছিল রুমাল, হয়ে গেল বেড়াল। আর এখানে হবে, ছিল ছবি, হয়ে গেল জ্যান্ত। হিহিহি-হেহেহে-হোহোহো ৷’
সত্যি বলতে কী, এখন সোমদেববাবুর মনে হচ্ছে এ পৃথিবীতে কিছুই অসম্ভব নয়। তিনি শুধু থ হয়ে বিড়ালের দিকে তাকিয়ে রইলেন।
বিড়াল কিন্তু গোঁফে তা দিয়ে হেসেই চলেছে। গোলাপি জিভ দিয়ে নিজের থাবা খানিক চেটে আবার বলল, ‘বিড়াল বলে আমায় বড্ড হেলা করেছ তুমি । জানো? তাবড় তাবড় তপস্বীকে আমার নাম উল্লেখ করে “বিড়াল তপস্বী” বলে সম্মান জানানো হয় ৷ '
‘না না না। এটা তোমার ভুল হচ্ছে পুসি,' প্রতিবাদ করে উঠলেন সোমদেববাবু, ‘বিড়াল তপস্বী তাঁকেই বলে যে কিনা ...,
‘আহ্, বড্ড কথা বলো তুমি।' তাঁকে মাঝপথে থামিয়ে বলে উঠল বিড়াল, ‘দ্যাখো পৃথিবীতে একমাত্র হিরোদের নিয়েই কথা হয়, জিরোদের নিয়ে নয়। আমরা হিরো বলেই আমাদের নিয়ে সমস্ত উপমা তৈরি হয়েছে। চালাক-চতুর অথচ গোবেচারা ভাব নিয়ে থাকলে তাঁকে “ভিজে বেড়াল” বলো, ধনী মানুষকে “ফ্যাট ক্যাট” বলো, নকলনবিশ দেখলেই কপিক্যাট বলো, গোপন কথা ফাঁস হয়ে গেলেই বলো “থলের বিড়াল বেড়িয়ে পড়েছে”, ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি এলেই বলো “রেইনিং ক্যাটস অ্যান্ড ডগজ”, ভাগ্য সুপ্রসন্ন হলেই গদগদ চিত্তে বলে ওঠো, “বিড়ালের ভাগ্যে শিকে ছিঁড়েছে।” ইত্যাদি আর কত বলব? অর্থাৎ তোমাদের সবেতেই বিড়াল। বিড়াল ছাড়া তোমাদের গতি নেই ৷’
সোমদেববাবু এবারে সহমতসূচক মাথা দোলালেন। এ কথাটা মিথ্যে নয়। সত্যি, বিড়াল ছাড়া তাঁর অন্তত কোনও গতি নেই। আর এখন তো নেই-ই। বিড়ালের অনুপস্থিতিতে তার সমস্ত আঁকাগুলো অসম্পূর্ণ দেখাচ্ছে। নরম সুরে বললেন, ‘সে আমি স্বীকার করছি পুসি। তোমাকে ছাড়া আমি সত্যি বড় অসহায় ৷’
‘আহ, ওই আদ্যিকালের “পুসি” নামটা ছাড়ো তো। কত সুন্দর সুন্দর নাম আছে আমার। নিউটন বা টমও তো বলতে পারো। জেরির সঙ্গে টিভিতে আমাকে দ্যাখোনি?’
হ্যাঁ, টম আর জেরিকে কে না দেখেছে? সোমদেববাবুও দেখেছেন। বললেন, ‘ঠিক আছে, তোমার কথাই থাকবে। কিন্তু এখন কথা হল, আমার ছবিগুলোতে কখন ফিরবে? আমার যে বড্ড তাড়া। কালই প্রদর্শনীর উদ্বোধন আছে।'
‘সে আমি কথা দিতে পারছি না বাপু।' মাছি তাড়ানোর ভঙ্গিতে থাবা নাড়িয়ে বিড়াল বলে উঠল। তারপর যোগ করল, “তোমার সঙ্গে আমি আর নেই। তুমি বাপু কম অবিচার করোনি আমার সঙ্গে! সামনে এত মাছ ছড়িয়ে রেখেছ, অথচ আমার মুখে একটিও নেই। টেবিলের উপরে হাজারো খাবার সাজানো, আর আমি টেবিলের নীচে বসে থাবা চাটছি। কোথাও ভজহরি গোঁসাই মাছ নিয়ে লোফালুফি খেলছে, আর আমি হাপিত্যেশ করছি এক টুকরো মাছের আশায়, বউমণিরা মাছের কত ব্যঞ্জন রেঁধে রসিয়ে রসিয়ে খাচ্ছে, আর অভূক্ত আমাকে তুমি বসিয়ে রেখেছ—আর কত বলব। তুমিই বলো, এসব কাঁহাতক সহ্য হয় ? নড়েচড়ে চুপটি করে নিজেই যে এক-আধখানা মাছ ম্যানেজ করে খাব, ছবির বিড়াল বলে সে উপায়ও নেই। এর আগেও বহুবার এমনটি হয়েছে। এসব দেখেই সিদ্ধান্ত নিয়েছি, আর তোমার সঙ্গে আমি থাকব না।’
‘না, না! তোমার অভিযোগ কিন্তু আমি পুরোপুরি মানতে পারছি না। গতকাল রাতে যে ছবিটা এঁকেছি, ওতে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে একটা মাছের কাঁটা তোমার পাশে পড়ে আছে। মাছটি নিঃসন্দেহে তুমিই খেয়েছিলে।'
‘হ্যাঁ, আমিই খেয়েছি বটে। কিন্তু তুমি সেটি আমাকে দাওনি। ছবির শর্ত ভেঙে ওটা আমি বউমণিদের ভাণ্ডার থেকে ম্যানেজ করেছি। রোস্টেড পমফ্রেটগুলো দেখে লোভ সামলাতে পারিনি কিনা, তাই নিতান্ত বাধ্য হয়েই...'
“ম্যানেজ করেছ মানে? চুরি করেছ? ছি ছি! এ তোমার থেকে আশা করিনি আমি। আমার বিড়াল চোর হবে, এ আমি কিছুতেই মানতে পারছি না।'
সোমনাথবাবুর কথা শুনে বেমক্কা গম্ভীর হয়ে গেল বিড়াল। শব্দ করে দীর্ঘশ্বাস ফেলল। তারপর গলার স্বর ভারী করে বলে উঠল, ‘আমি চোর বটে, কিন্তু আমি কি সাধ করিয়া চোর হইয়াছি? খাইতে পাইলে কে চোর হয়?”
এবারে রীতিমতো বিষম খেলেন সোমদেববাবু। বিড়াল তবে বঙ্কিম সাহিত্যও পড়েছে? এ যে হুবহু সাহিত্য সম্রাটের লেখা থেকে উদ্ধৃতি দিচ্ছে! এ তবে যে সে বিড়াল নয়, সুশিক্ষিত বিড়াল। অর্থাৎ তাঁকে বেশ সমঝে চলতে হবে। তাঁর এখন বাস্তবিকই নাজেহাল অবস্থা ৷ এমন একটা পরিস্থিতি যে তাঁকে কখনও সামলাতে হবে, তিনি স্বপ্নেও ভাবেননি। সমঝোতার পথে এগোতে চাইলেন তিনি। তিনিও বঙ্কিম অর্থাৎ বাঁকা পথই ধরলেন। গলার স্বর আরও অনেকটা নামিয়ে পান্তুয়ার মতো নরম করে বললেন, ‘হে অতি মর্যাদাপূর্ণ মার্জিত মির্জাফর, থুড়ি মার্জার, স্বকর্ণ মর্জন পূর্বক মার্জনা প্রার্থনা করি। মঞ্জুর করিলে কৃতার্থ হই। মর্জি হইলে জীবনের মারাত্মক মারপ্যাঁচ হইতে মুক্তি দিয়া আমি হেন মজ্জমান তরীটিকে মার্গ দর্শাইবেন।’
এবারে মর্যাদাপূর্ণ মার্জিত মির্জাফর ওরফে মার্জার তথা ছবির বিড়ালের চোখ ছানাবড়া। চোখ পিটপিট করে একটা মোটা তুলি দিয়ে গোঁফ আঁচড়াতে আঁচড়াতে বলল, 'বাহ্! বেড়ে বলেছ তো ! ঠিক আছে, মার্জনা করার মর্জি মজুত। কিন্তু একটা শর্ত আছে।'
‘আমি সব শর্ত মানতে প্রস্তুত। বলো কী শর্ত?' আসন্ন প্রদর্শনীর কথা ভেবে সোমদেববাবু মরিয়া, ‘হাতে সময় বড় কম। ফিরে এসো আমার ছবিতে।'
বিড়াল এবারে উঠে দাঁড়াল। তারপর মস্ত এক লাফ দিয়ে ইজেল স্ট্যান্ডের মাথায় চড়ে বসে লেজ দুলিয়ে বলল, “শর্ত অতি সামান্যই। সমস্ত ছবিতে আমার প্রতি যে অবিচার করেছ এতদিন, তার প্রায়শ্চিত্ত করবে আরও একটি যথাযথ ছবি এঁকে। '
‘মঞ্জুর।’ বলেই উচ্ছ্বাসে লাফিয়ে উঠলেন শিল্পী সোমদেব সোম। এরপর শর্ত তিনি সত্যিই রাখলেন। না রেখেও তো উপায় ছিল না। সে দিনই আরেকটা ছবি আঁকলেন তিনি। পরের দিন প্রদর্শনীর মূল আকর্ষণ হল তাঁর শেষতম ছবিটিই। ওতে দেখা যাচ্ছে, এক বিরাট ভোজসভায় লাল টুকটুকে মখমলের গদিতে বসে আছে তাঁর বিড়াল । আর বিড়ালের চারপাশে সাজানো রেকাবি ভর্তি অজস্র মৎস্য ব্যঞ্জন। রুই, কাতলা, ইলিশ, মাগুর, শোল, চিংড়ি, পুঁটি, কই, পাবদা, ট্যাঙরা, লটে, বোয়াল, বাউশ, মৌরলা, ভেটকি, গোলসা, পমফ্রেট, চাঁদা, চাপিলা, চিতল, মৃগেল, আড়, কাজলি, বোরোলি, কী নেই ওতে?
বিড়াল খুশি। তার চোখের কোণে তৃপ্তি আর গোঁফের ফাঁকে হাসি। সে আবার ফিরে এসেছে শিল্পীর সমস্ত ছবিতে। রমরমিয়ে চলছে সোমদেববাবুর প্রদর্শনী। চাইলে তোমরাও দেখে আসতে পারো।

No comments